সুকান্তের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করল উদীচী

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উদীচীর আয়োজনে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা

ঢাকায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আলোচনা, শ্রদ্ধা নিবেদন, গান, নৃত্য ও আবৃত্তির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করবো নতুন ভিত্তি’ শ্লোগানকে সামনে রেখে শুক্রবার (২৮শে আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম। আলোচনায় অংশ নেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ, লেখক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল খায়ের। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উদীচীর সহ-সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, মাত্র ছয়-সাত বছরের কবিজীবন হলেও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। তাঁর কবিতায় সাহিত্যিক দায়ের পাশাপাশি রাজনীতি, মতাদর্শ এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এবং দুর্ভিক্ষের সময়ে মানুষের দুর্দশা সুকান্তের কবিতায় গভীরভাবে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা। তাঁদের মতে, ফ্যাসিবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা এবং শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের সংগ্রামের প্রতি সংহতি তাঁর সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বক্তারা আরও বলেন, সুকান্তের কবিতার সময়পর্বটি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের পরাজয় থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলন, নৌবাহিনীর বিদ্রোহ, শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং দেশভাগের আগের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—এই সময়ের নানা ঘটনা তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে।

উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, সুকান্তের মৃত্যুর প্রায় আট দশক পরও বাংলাদেশের সমাজে এমন অনেক সংকট রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে তাঁর কবিতার ভাবনার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সামাজিক অবিচার ও পরিবেশগত সংকট এখনো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে অমিত রঞ্জন দে বলেন, ওই পরিবর্তনের পর মানুষ গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজের নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগোতে চেয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের পরিবর্তনের ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে।

তাঁর ভাষায়, শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন মানুষের প্রত্যাশিত সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক করা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক পরিবর্তন অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

অমিত রঞ্জন দে বলেন, এখানেই সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁর সাহিত্য ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের জীবনের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়েছে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র কিংবা উন্নয়নের অর্থ তখনই বাস্তব হয়, যখন তার ঘরে খাবার থাকে, শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকে, সন্তান নিরাপদে বেড়ে ওঠে এবং সে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।

উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, মানুষের বিভিন্ন সংগ্রাম ও আন্দোলনে সুকান্তের কবিতা আজও অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর ভাষায়, “যেখানেই সংগ্রাম-যুদ্ধ, সেখানেই সুকান্ত।”

আলোচনা শেষে সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা মহানগর সংসদ ও বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীরা। পরে শত প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি শপথ হিসেবে পাঠ করান উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন।

সাংস্কৃতিক পর্বে সুকান্তের ‘অবাক পৃথিবী’ গান অবলম্বনে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে ধৃতি নর্তনালয়। এর পরিচালনায় ছিলেন ওয়ার্দা রিহাব।

উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’, ‘হে সাথী আজকে স্বপ্নের দিন গোনা’ এবং ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’—এই তিনটি সমবেত গান। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন অলক দাশগুপ্ত, জয়া সেনগুপ্তা, শাওন কুমার রায়, সরস্বতী সরকার ও বিজয় বণিক।

অনুষ্ঠানে উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা ‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করবো নতুন ভিত্তি’ শিরোনামে সম্মেলক আবৃত্তি পরিবেশন করেন। এর পরিকল্পনায় ছিলেন বেলায়েত হোসেন এবং নির্দেশনায় শিখা সেনগুপ্তা। একক আবৃত্তি করেন মো. মাসুদুজ্জামান, শিখা সেনগুপ্তা ও সুমিত পাল। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্রোত আবৃত্তি সংসদ।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ মিতা রায় ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শেখ আনিসুর রহমান।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদীচী তাঁর কবিতা ও সাহিত্যকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, সমকালীন সমাজের বৈষম্য, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গেও নতুন করে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *