ভূমির সুরক্ষা ছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা সম্ভব নয়: পরিবেশমন্ত্রী

ভূমির সুরক্ষা ছাড়া জলবায়ু সহনশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, এমপি। তিনি বলেছেন, ভূমিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে অর্থনীতি ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সোমবার (২৪শে আগস্ট) মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটরে জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের (UNCCD) ১৭তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ—COP17-এর ফাইন্যান্স ডে উপলক্ষে আয়োজিত মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপের বিষয় ছিল ‘স্বাস্থ্যকর ভূমি ও খরা সহনশীলতায় উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা’।

মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য ভূমির স্বাস্থ্য রক্ষা এখন বড় জাতীয় অগ্রাধিকার। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, বনভূমির অবক্ষয়, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিক্ষয়, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং নদীভাঙনের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় জাতীয় পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষিকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও জলবায়ু-সহনশীল করে তুলছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য ঋণ ও অন্যান্য কৃষি সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। তবে ছোট কৃষক এবং ভূমি পুনরুদ্ধারের মতো কাজে অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যারান্টি, প্রাথমিক ক্ষতির মূলধন এবং মিশ্র অর্থায়নের মতো ব্যবস্থা ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নের উদাহরণ তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ২০০৯ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে জলবায়ু ও ভূমির সহনশীলতা বাড়াতে দেশীয় অর্থায়ন করা হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শুরুর দিকের এই উদ্যোগে এখন পর্যন্ত ৪৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ সংস্থান করা হয়েছে।

এই অর্থায়নের মাধ্যমে ১২টি নতুন প্রতিকূলতা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের মধ্যে ১৯ হাজার ৪০০ মেট্রিক টনের বেশি খরা ও লবণাক্ততা-সহনশীল বীজ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রয়োজন বাড়ায় বর্তমানে তহবিলটির বার্ষিক বরাদ্দের চেয়ে চাহিদা বেশি।

মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগের বিকল্প হওয়া উচিত নয়। বরং দেশের বিদ্যমান অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঋণের বিনিময়ে প্রকৃতি ও জলবায়ু সংরক্ষণ এবং ভূমি পুনরুদ্ধারে সবুজ বন্ডের মতো নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন তিনি।

এ ধরনের অর্থায়ন কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির নিয়ন্ত্রিত পুনর্ভরণ, কৃষি ও বনায়ন, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি এবং উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার আরও জোরদার করা সম্ভব বলে জানান মন্ত্রী। এসব উদ্যোগের সঙ্গে জাতীয়ভাবে ২৫ কোটি চারা রোপণের সবুজ মিশনও যুক্ত করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের জন্য আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, উজানের পানিপ্রবাহে পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রে লবণাক্ততা ও খরার ঝুঁকি বাড়ে। তাই অভিন্ন নদী অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে পানিবণ্টন আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি পানি-সংকট ও ভূমি অবক্ষয় নিয়ে তথ্য বিনিময়ের জন্য যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ সহযোগিতা দিতে এবং গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তবে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এমন উদ্যোগ প্রয়োজন যার নির্দিষ্ট লক্ষ্য, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা থাকবে। এর মাধ্যমে ভূমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে অর্থায়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।

UNCCD COP17-এর উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন উদ্বোধন করেন মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট খুরেলসুখ উখানা। অনুষ্ঠানে মঙ্গোলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও COP17-এর সভাপতি বাতসেতসেগ বাতমুনখ, জাতিসংঘের উপমহাসচিব আমিনা জে. মোহাম্মদ, UNCCD-এর নির্বাহী সচিব ইয়াসমিন ফুয়াদসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলের প্রধানরা অংশ নেন।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভূমি, পানি ও কৃষি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে ভূমির অবক্ষয় ঠেকাতে অর্থায়ন বাড়ানো শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *