পনেরো বছর আগে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের একটা মোড়ে থেমে গেল বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে র্যাডিকাল ক্যামেরা। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো তিনি তুলে গেছেন, সেগুলো আজও উত্তর খুঁজছে।
১৩ই আগস্ট, ২০১১। মানিকগঞ্জের ঘিওর।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ। মাইক্রোবাসের ভেতরে—তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীর। তাদের সাথে ছিলেন মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজুর রহমান, ফিল্ম প্রোডাকশনের ক্রু সদস্য ওয়াসিম ও জামাল। আর আহত অবস্থায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদসহ আরও কয়েকজন।
কিন্তু বিষয়টা কি শুধু দু’জন নির্মাতার মৃত্যু? নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?
গল্পটা শুরু করা যাক একটা অসমাপ্ত সিনেমা থেকে।
২০০০ সালের অক্টোবর। ঢাকার আহসান মঞ্জিল, ইসলামপুরের গোল তালাবের পাশের একটা বাড়ি, নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থান।
তারেক মাসুদ একটা ডকুমেন্টারি নির্মাণ করছিলেন এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা’র চলচ্চিত্র পাঠের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা শর্ট কোর্সের অংশ হিসেবে । বিষয়টা চমকপ্রদ—ঢাকার প্রথম আকাশচারী, বেলুন চালক জেনেট ভ্যান তাসেলের জীবন।
সিনেমাটা আর শেষ হয়নি।
কিন্তু এই অসমাপ্ত সিনেমাটাই হয়তো তারেক মাসুদকে সবচেয়ে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করে। একজন নির্মাতা, যিনি সবসময়ই এমন গল্প খুঁজতেন, যেটা কেউ বলেনি। যে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে, সেই ইতিহাসকে আবার জীবিত করতে চেয়েছেন।
তারেক মাসুদের গল্পটা শুরু ১৯৫৬ সালে, ফরিদপুরের ভাঙ্গায়, নূরপুর গ্রামে।
প্রথম পড়াশোনা ভাঙ্গা ঈদগাহ মাদ্রাসায়। পরে ঢাকার লালবাগের এক মাদ্রাসা থেকে মওলবি পাস। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি।
এরপর সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ। ফরিদপুর ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, তারপর নটর ডেম কলেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স।
এই যে মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—এই পথটাই পরবর্তীকালে ‘মাটির ময়না’র গল্প হয়ে উঠল।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন। ১৯৮২-র শেষ দিকে প্রথম ডকুমেন্টারি নির্মাণ শুরু। ১৯৮৯-এ মুক্তি পেল ‘আদম সুরত’—এস এম সুলতানের জীবন নিয়ে।
এবং এরপর থেকে শুরু হলো একটা এমন যাত্রা, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে চিরকালের জন্য বদলে দিল।
১৯৯৫। ‘মুক্তির গান’ মুক্তি পেল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এর আগে যেসব ছবি হয়েছিল, সেগুলো ছিল অফিসিয়াল বয়ান—বীরত্ব, রক্ত, পতাকা।
তারেক মাসুদ করলেন ভিন্ন কিছু।
মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ ফুটেজ, লালন-ফকিরের গান, আর সাধারণ মানুষের কণ্ঠ—এই তিনটে জিনিস মিশিয়ে তিনি বানালেন এক নতুন ধরনের ‘ডকু-ফিকশন’।
যুদ্ধটা শুধু যোদ্ধাদের নয়, এই ছবিতে যুদ্ধটা হয়ে উঠল গায়কদের, বাউলদের, সাধারণ গ্রামীণ মানুষের।
১৯৯৯-এ এলো ‘মুক্তির কথা’। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের গল্প বললেন।
তারপর ‘নারীর কথা’। যে যুদ্ধে নারীদের অভিজ্ঞতা প্রায় বর্জিতই ছিল, সেখানে তারেক মাসুদ নারীদের কণ্ঠস্বরকে কেন্দ্রে আনলেন।
এই তিনটে ছবি মিলে একটা ট্রিলজি তৈরি হলো—থিসিস, অ্যান্টিথিসিস, সিনথেসিস।
জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর পর ‘মুক্তির গান’-কেই বিবেচনা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সেরা প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে।
২০০২। ‘মাটির ময়না’ মুক্তি পেল।
তারেক মাসুদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র। আর এটাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটা টার্নিং পয়েন্ট।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে ফিপ্রেস্কি পুরস্কার। এডিনবার্গ, মন্ট্রিল, কায়রোতে প্রদর্শিত। মারাকেশে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার। করাচিতে সেরা সিনেমার পুরস্কার। ব্রিটেনের ডিরেক্টরস গিল্ড পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—’মাটির ময়না’ বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারের বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল।
একটা দেশ, যেদেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় অদৃশ্যই ছিল, হঠাৎ করেই কানের মঞ্চে উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু ‘মাটির ময়না’ কি শুধু একটা আত্মজীবনীমূলক ছবি?
তারেক মাসুদ নিজে বলতেন—না। এটা শৈশবের স্মৃতি আর ট্রমার সাথে আপস করার একটা ছবি।
মাদ্রাসা শিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কাল, গ্রামীণ বাংলা—সব কিছু একসাথে মিশে গেল একটা শিশুর চোখের গল্পে।
—’তারেক মাসুদকে যতটা ভাবা হয়, তিনি তার চেয়েও র্যাডিকাল ছিলেন।’
কেন এই কথাটা?
কারণ তারেক মাসুদ শুধু একজন নির্মাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন চিন্তক, যিনি চলচ্চিত্রকে দেখতেন সমাজভাবনা, রাজনৈতিক বক্তব্য আর দার্শনিক অনুসন্ধানের মাধ্যম হিসেবে।
‘আদম সুরত’ শুধু এস এম সুলতানের জীবনী নয়। এটা একটা শ্রেণী-বিশ্লেষণ।
তারেক মাসুদ এই ছবিতে দেখিয়েছেন—কীভাবে বাংলাদেশের বুর্জোয়া আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী সুলতানের শিল্পকে নিজেদের সংস্কৃতির অংশ করে ফেলতে চায়, অথচ সুলতানের শিল্প সেই শ্রেণীর চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সুলতান তার ছবিতে গ্রামের শোষিত কৃষকদের শক্তিশালী, পেশীবহুল, আত্মশক্তিতে বলিয়ান করে এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন—গ্রামের মানুষই প্রকৃত উৎপাদনশীল, মাটির অধিকারী।
আর তারেক মাসুদ এই বার্তাটাকেই ক্যামেরায় ধরলেন।
দুজনেই ছিলেন শেকড়-সন্ধানী শিল্পী। দুজনেই সাধারণ মানুষের আত্মশক্তি আর সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তাদের শিল্পে ধারণ করেছেন।
তারেক মাসুদকে বলা হয় ‘সিনেমার ফেরিওয়ালা’।
কারণ তিনি শুধু সিনেমা বানাতেন না, তিনি সেই সিনেমা নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে যেতেন। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন।
১৯৮৮-এ ঢাকায় প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
তিনি জানতেন—সিনেমা শুধু শহরের এয়ারকন্ডিশনড হলের জন্য নয়। সিনেমা সেই মানুষের জন্য, যারা কখনো হলে ঢোকেনি।
এবং এই যে ‘সিনেমার ফেরিওয়ালা’ হওয়া—এটাই তাকে বাকি সব নির্মাতাদের থেকে আলাদা করে।
তারেক মাসুদের সিনেমার শৈলী নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। সমালোচকরা তার সিনেমাকে সত্যজিৎ রায়ের কাব্যিক বাস্তববাদ আর আব্বাস কিয়ারোস্তামির সূক্ষ্ম মানবিকতার সাথে তুলনা করেছেন।
কিন্তু তারেক মাসুদ সেই প্রভাবগুলোকে বাঙালি প্রেক্ষাপটে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন।
তারেক মাসুদের শেষ দিকের একটা কাজ। আর এটা ছিল সমকালীন বাংলাদেশের একটা তীক্ষ্ণ পোর্ট্রেট। বেকারত্ব, গার্মেন্টস, অভিবাসন, উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া তরুণ—এই সবকিছু একসাথে মিলে গেল একটা গল্পে।
আজ যখন আমরা দেখি দেশের তরুণরা কীভাবে হতাশা থেকে উগ্রবাদে, অথবা অভিবাসনের অসম সাহসিকতায় ঝুঁকে পড়ছে, তখন ‘রানওয়ে’ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তারেক মাসুদ ২০১০-এ যা দেখে ফেলেছিলেন, যা আমরা আজ দেখছি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—তারেক মাসুদ কি শুধুই একজন নির্মাতা ছিলেন?
নাকি তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক চিন্তক, যিনি ক্যামেরাকে একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?
তার তিনটে প্রধান আগ্রহের জায়গা ছিল—মুক্তিযুদ্ধ, নারী, আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
প্রায় প্রতিটা কাজেই এই তিনটে বিষয়ের উপস্থিতি।
‘নারীর কথা’, ‘সোনার বেড়ি’, ‘নরসুন্দর’—এই কাজগুলোতে নারীর অবস্থান আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন উঠে এসেছে।
‘নরসুন্দর’ একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের একটা বিকল্প বয়ান আছে। একজন বিহারী নরসুন্দরের মানবিকতা দেখিয়ে তিনি প্রথাগত বয়ান ভেঙে দিয়েছেন।
এটা কি শুধু সিনেমা? নাকি একটা রাজনৈতিক অবস্থান?
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে আসে একটা কেন্দ্রীয় প্রশ্ন—সীমাবদ্ধতা বনাম মুক্তি।
ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক—সব স্তরেই এই দ্বন্দ্ব চলমান।
‘মাটির ময়না’তে একটা শিশু মাদ্রাসার সীমাবদ্ধতা আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের মাঝে দ্বন্দ্বে থাকে।
‘অন্তর্যাত্রা’তে একজন প্রবাসী তার পরিচয় আর শেকড়ের মাঝে দ্বন্দ্বে থাকে।
‘রানওয়ে’তে একজন তরুণ বেকারত্ব আর উগ্রবাদের মাঝে দ্বন্দ্বে থাকে।
এবং এই দ্বন্দ্বটাই তারেক মাসুদকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রাখে।
তাকে বলা হয় ‘সিনেমার চে গুয়েভারা’।
কেন?
কারণ তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী। কিন্তু তার বিপ্লব ছিল ক্যামেরার মাধ্যমে।
তিনি মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার সূত্র—মারামারি, অতিরিক্ত মেলোড্রামা, গান-নাচের ফর্মুলা—সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তিনি দেখিয়েছিলেন—সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটা সমাজভাবনা, রাজনৈতিক বক্তব্য আর দার্শনিক অনুসন্ধানের মাধ্যম হতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় কথা—তিনি এই বিপ্লবটা করেছেন এমন একটা দেশে, যেদেশের চলচ্চিত্রশিল্প তখন ক্রমাগত অবনতির মুখে।
আগস্ট, ২০২৬।
তারেক মাসুদ চলে গেছেন পনেরো বছর হলো। কিন্তু তার ছবিগুলো আজও বেঁচে আছে।
‘মুক্তির গান’ আজও নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ উপলব্ধি করতে শেখায়। ‘মাটির ময়না’ আজও কানের মঞ্চে বাংলাদেশের গর্ব। ‘রানওয়ে’ আজও সমকালীন বাংলাদেশের একটা সতর্কবার্তা।
আর যে ছবিটা তিনি বানাতে পারেননি—জেনেট ভ্যান তাসেলের সেই ডকুমেন্টারি—সেটা আজও একটা অসমাপ্ত স্বপ্ন হিসেবে থেকে গেছে।
তারেক মাসুদ কম সংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। কিন্তু প্রতিটা কাজই গভীর আর স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে।
তিনি বাংলাদেশি সিনেমার সেই নির্মাতা, যিনি ইতিহাসকে শুধু রেকর্ড করেননি—তাকে প্রশ্ন করেছেন। আর মানুষের ভেতরের মুক্তির পথ খুঁজেছেন।
আজ পনেরো বছর পর যখন আমরা তাকে স্মরণ করি, তখন একটা কথা মনে রাখা দরকার—
তারেক মাসুদ শুধু একজন নির্মাতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটা আন্দোলন। একটা চিন্তাধারা। একটা বিবেক।
আর সেই বিবেকটা আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে, বাংলাদেশের সমাজকে, বাংলাদেশের মানুষকে প্রশ্ন করে চলেছে—
তুমি মুক্ত হয়েছ তো?
সত্যিই মুক্ত?
নাকি নতুন কোনো সীমাবদ্ধতার ভেতরে আটকে আছ?
তারেক মাসুদের ছবিগুলো আজও এই প্রশ্নটা তুলে যায়।
আর উত্তরটা আমাদেরই দিতে হবে।