ডাঃ জহিরুল ইসলাম
আমরা সম্ভবত ক্রোধের এক সময়ে বাস করছি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে রাজনীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাষ্ট্র—চারদিকে জমে আছে অভিযোগ, অপমান, প্রতিশোধ আর পুরোনো ক্ষতের স্মৃতি। এই ক্রোধের সবটাই অকারণ নয়। অন্যায় আছে বলেই ক্রোধ আছে; অপমান আছে বলেই ক্ষোভ আছে। কোনো কোনো সময় ক্রুদ্ধ না হওয়াটাই বরং নৈতিক অসাড়তার লক্ষণ। কিন্তু প্রশ্নটি ক্রোধ নিয়ে নয়, প্রশ্নটি আসে তার পরে—ক্রোধ নিয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত কী করব?
যে আমাকে আঘাত করেছে, তাকে কি ক্ষমা করব? ক্ষমা করলে কি অন্যায়কে মেনে নেওয়া হয়? আর ক্ষমা না করলে সেই আঘাতকে কত দিন নিজের মধ্যে বহন করতে হয়? ন্যায়বিচার আর ক্ষমা কি পরস্পরের বিরোধী?
প্লেটো আধুনিক অর্থে ক্ষমার কোনো তত্ত্ব নির্মাণ করেননি। কিন্তু রিপাবলিক-এ মানুষের আত্মা নিয়ে তাঁর যে ভাবনা, তার মধ্যে ক্ষমার একটি সূত্র পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে যেমন যুক্তি আছে, তেমনি আছে আকাঙ্ক্ষা ও থাইমোস—আত্মমর্যাদা, সাহস, ক্ষোভ ও ক্রোধের সেই প্রবৃত্তি, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড়াতে শেখায়। ফলে ক্রোধ নিজে দোষের কিছু নয়। বিপদ ঘটে তখনই, যখন ক্রোধ যুক্তির কথা শোনা বন্ধ করে দেয়।
যে মানুষ আমাকে আঘাত করেছে, সে হয়তো বহু আগেই আমার জীবন থেকে চলে গেছে। কিন্তু তার প্রতি ক্রোধ যদি প্রতিদিন আমার চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে—মানুষটি অনুপস্থিত থেকেও আমার ওপর তার কর্তৃত্ব বজায় রাখে। প্লেটোর ভাষায়, তখন আমার নিজের আত্মার ওপর আমার কর্তৃত্বই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অর্থে ক্ষমা অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়; বরং নিজের ভেতরের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়া।
অ্যারিস্টটল বিষয়টিকে আরেকটু বাস্তব জায়গায় নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে নৈতিকতা মানে ক্রোধহীন হয়ে যাওয়া নয়। বরং সঠিক কারণে, সঠিক মানুষের প্রতি, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময় পর্যন্ত ক্রুদ্ধ হতে পারাটাই গুণ। অন্যায় দেখে যে কখনো রাগ করে না, তার মধ্যে নৈতিক ঘাটতি থাকতে পারে; আবার যে প্রতিটি অপমান আজীবন বহন করে, তার ক্রোধ একসময় ন্যায়বোধের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
ক্রোধ আমাদের বলতে পারে—আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু ক্রোধ নিজে বলতে পারে না—এই অন্যায় আমি কত দিন বহন করব। এই দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর দিতে লাগে বিচারবোধ।
নিটশের কাছে এসে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন দ্য জিনিয়োলজি অব মোরালিটি-তে তিনি যে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন—রিসেন্টিমেন্ট—তার বাংলা করা কঠিন। ক্ষোভ, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা—সবই এর মধ্যে আছে, কিন্তু কোনো একটির মধ্যেই শব্দটির অর্থ শেষ হয় না। রিসেন্টিমেন্ট হলো এমন এক জমাট ক্ষোভ, যেখানে পুরোনো আঘাত ধীরে ধীরে মানুষের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
সাধারণ ক্রোধ বলে, ‘তুমি আমাকে আঘাত করেছ।’
কিন্তু রিসেন্টিমেন্ট একসময় বলতে শুরু করে, ‘তুমি আমাকে আঘাত করেছ বলেই আমি জানি তুমি কে; আর তুমি কে, সেটাই আমাকে বলে দেয় আমি কে।’
এখানেই নিটশের প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচার চাই, নাকি কোনো কোনো সময় নিজের ক্ষতটির প্রতিই আসক্ত হয়ে পড়ি?
মানুষের মতো সমাজও তার শত্রুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক দল, সম্প্রদায়, এমনকি জাতিও কখনো কখনো পুরোনো অপমানকে এমনভাবে বহন করে যে শত্রুটি তার আত্মপরিচয়ের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শত্রু না থাকলে তখন নিজের পরিচয়টিই যেন অস্পষ্ট হয়ে যায়।
নিটশে অবশ্য খ্রিষ্টীয় অর্থে ক্ষমার কথা বলছেন না। অপরাধ, পাপ, অনুশোচনা ও ক্ষমার নৈতিক হিসাবের ব্যাপারেই তাঁর গভীর সন্দেহ ছিল। তাঁর কাছে মুক্তির পথ বরং সেলফ ওভারকামিং—নিজেকে অতিক্রম করা। অতীতকে বদলানো যাবে না; কিন্তু অতীত আমার ভবিষ্যৎকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই প্রশ্নটি এখনো আমার হাতে।
এখানেই আমর ফাতি—নিজের নিয়তিকে গ্রহণ করার নিটশীয় ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যা ঘটেছে তাকে ভালো বলা নয়, বরং যা ঘটেছে তাকেও নিজের জীবনের অংশ হিসেবে ধারণ করে এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা, যা আর সেই ঘটনার বন্দী নয়। সম্ভবত শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিজয় প্রতিশোধ নয়। এমন এক মানুষ হয়ে ওঠা, যার বেঁচে থাকার জন্য আর সেই শত্রুটির প্রয়োজন হয় না।
হান্না আরেন্ট ক্ষমাকে নিয়ে যান সরাসরি মানুষের কর্ম ও রাজনীতির জগতে। দ্য হিউম্যান কন্ডিশন-এ তিনি মানুষের কাজের একটি মৌলিক সমস্যার কথা বলেন—ইরেভারসিবিলিটি, অর্থাৎ যা ঘটে গেছে তাকে আর না-ঘটানো যায় না। বলা কথা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, করা অপমান মুছে দেওয়া যায় না, হত্যাকে অঘটন করা যায় না। ইতিহাসের কোনো ‘আনডু’ বোতাম নেই।
তাহলে মানুষ কি তার প্রতিটি অতীত কর্মের কাছে চিরকাল বন্দী থাকবে?
আরেন্টের কাছে ক্ষমা এই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসার একটি মানবিক সামর্থ্য। ক্ষমা গতকালকে বদলায় না; গতকালের সঙ্গে আগামীকালের সম্পর্কটিকে বদলে দেয়।
রাজনীতিতে এর তাৎপর্য আরও গভীর। একটি আঘাত আরেকটি প্রতিশোধ ডেকে আনে; সেই প্রতিশোধ জন্ম দেয় পাল্টা প্রতিশোধের; তারপর ক্ষোভ উত্তরাধিকার হয়ে পরের প্রজন্মে পৌঁছায়। এভাবে ইতিহাস একটি দীর্ঘ প্রতিহিংসার শৃঙ্খলে পরিণত হতে পারে। কোনো এক জায়গায় কাউকে সেই শৃঙ্খলটি ভাঙতে হয়।
কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি, এবং সম্ভবত দেরিদা সেটিকেই সবচেয়ে নির্মমভাবে সামনে এনেছেন।
দেরিদার কাছে ক্ষমা একটি অসম্ভবতার নাম। যে অপরাধ সহজেই ক্ষমাযোগ্য, তাকে ক্ষমা করার মধ্যে বিশেষ কোনো দার্শনিক সমস্যা নেই। কেউ ভুল করল, অনুতপ্ত হলো, ক্ষতিপূরণ দিল, আমি তাকে ক্ষমা করলাম—এখানে একটি বিনিময়ের হিসাব কাজ করছে। তুমি অনুতপ্ত হয়েছ, তাই আমি ক্ষমা করছি।
কিন্তু দেরিদা প্রশ্ন করেন, যা ক্ষমার অযোগ্য, তাকে কি ক্ষমা করা সম্ভব? তাঁর বিখ্যাত আপাত-বিরোধী ধারণাটি এখানেই: প্রকৃত ক্ষমার প্রয়োজন হয় ঠিক সেখানেই, যেখানে ঘটনাটি অক্ষমণীয়। এর অর্থ অপরাধীর শাস্তি হবে না—এ কথা নয়। দেরিদা ক্ষমাকে বিচার, সাধারণ ক্ষমা, রাজনৈতিক মীমাংসা কিংবা পুনর্মিলনের সঙ্গে এক করে দেখেন না। রাষ্ট্র কাউকে শাস্তি দিতে পারে, অথচ ভুক্তভোগী তাকে ক্ষমা করতে পারেন। আবার রাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করতে পারে, অথচ মানুষের ভেতরে কোনো ক্ষমাই না ঘটতে পারে।
এই পার্থক্যটি খুব জরুরি।
ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়। ক্ষমা মানে অপরাধকে নির্দোষ ঘোষণা করা নয়। ক্ষমা মানে আবার সম্পর্ক স্থাপন করাও নয়। আমি কাউকে ক্ষমা করেও বলতে পারি—তুমি অন্যায় করেছ। আমি ক্ষমা করেও বিচার চাইতে পারি। এমনকি কাউকে ক্ষমা করার পরও সিদ্ধান্ত নিতে পারি, জীবনে আর কখনো তার কাছে ফিরে যাব না।
এমানুয়েল লেভিনাস অন্য দিক থেকে একই সমস্যায় পৌঁছান। অন্য মানুষের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে তিনি একটি নৈতিক আহ্বান দেখতে পান। ঘৃণার সমস্যা হলো, সে একজন মানুষকে তার একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলে—শত্রু, বিশ্বাসঘাতক, অপরাধী, নিপীড়ক। মানুষটির সমস্ত অস্তিত্ব তখন তার সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজটির সমান হয়ে যায়। অথচ ‘তুমি অন্যায় করেছ’ এবং ‘তুমি শুধু এই অন্যায়টিই’—এই দুই বাক্যের মধ্যে বিরাট নৈতিক ব্যবধান আছে। প্রথমটি বিচার দাবি করে। দ্বিতীয়টি মানুষটিকেই সম্পূর্ণভাবে মুছে দেয়।
মার্ক্স ও ফ্যানন আমাদের সতর্ক করেন আরেকটি বিপদ সম্পর্কে। অনেক ক্ষতের পেছনে ব্যক্তিগত অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো থাকে। তাই ক্ষমার নামে নিপীড়িতকে চুপ করানো কিংবা জবাবদিহি এড়ানো ক্ষমা নয়—বিস্মৃতি চাপিয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে তাই বলা সম্ভব: আমি তোমাকে চিরকাল ঘৃণা করতে চাই না; কিন্তু তোমার অন্যায়ের বিচার চাই।
লাকাঁ আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেন। আমরা কি কখনো নিজের ক্ষোভের মধ্যেই এক ধরনের আনন্দ খুঁজে পাই? একই অপমান বারবার স্মরণ করতে করতে ক্ষতটি কি আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে? তখন প্রশ্নটি হয়—আমার শত্রু না থাকলে আমি কে?
হয়তো ক্ষমার গভীরতম অর্থ এটুকুই: যে আমাকে আঘাত করেছে তাকে নির্দোষ করা নয়, তাকে আবার আপন করে নেওয়াও নয়; বরং তার কাছ থেকে একটি অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া—
আমি ভবিষ্যতে কে হয়ে উঠব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।