জনপ্রশাসনে এআই ব্যবহারের তাগিদ, তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবাকে আরও দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে যথাযথ সম্মতি এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২০শে আগস্ট) ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘এআই এন্ড গর্ভনেন্স: গ্লোবাল টেকনলজি আর্কিটেকচার, ন্যাশনাল ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রস্ট্রাকচার এন্ড পলিসি ডিরেকটিভস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এটি জাতীয় সক্ষমতা, সুশাসন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই জনগণের সম্মতি, সচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে এআই গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মেধাবী ও দক্ষ মানুষের পাশাপাশি রয়েছে বিশাল জনসংখ্যা ও বিপুল সম্ভাবনা। তবে শুধু মেধা থাকলেই জাতীয় সক্ষমতা তৈরি হয় না। মেধাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। প্রযুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এবং সেই সক্ষমতাকে জাতীয় শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এ জন্য একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত এআই ইকোসিস্টেম প্রয়োজন।

জনপ্রশাসনকে বাংলাদেশের এআই রূপান্তরের প্রথম বড় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে কোনো তথ্যের জন্য কর্মকর্তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফাইল খুঁজতে হবে না। অন্য দপ্তরে যোগাযোগ করেও তথ্য সংগ্রহ করতে হবে না। অনুমোদিত সরকারি তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে এআই সহকারী প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে পারবে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিধি, পরিপত্র, আগের সিদ্ধান্ত এবং তথ্যের উৎসও যুক্ত করা যেতে পারে বলে জানান তিনি। এতে কর্মকর্তাদের সময় বাঁচবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার দক্ষতাও বাড়বে।

যুক্তরাজ্য সরকার সরকারি কর্মচারীদের এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকেও এ বিষয়ে আর অপেক্ষা করা উচিত নয়।

সরকারি ব্যয়, সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, করব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ও ফাইল ব্যবস্থাপনাসহ জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগ প্রকল্প প্রণয়ন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই এবং প্রকল্প পর্যবেক্ষণে এআই ব্যবহার করতে পারে বলে মত দেন তিনি। এর ফলে সময় ও সরকারি অর্থের অপচয় কমানো সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ নাগরিক ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সেবাকেও এআইয়ের মাধ্যমে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ইসমাইল জবিউল্লাহ।

তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের জন্য কোন তথ্য কতটুকু ব্যবহার করা যাবে এবং কোন স্তরে তথ্য শেয়ার করা যাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যথাযথ সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতারণার ঝুঁকি মোকাবিলায় জনসচেতনতার পাশাপাশি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

এআইয়ের প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও দ্রুত বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধান অতিথি।

তিনি বলেন, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং নির্ভুল অভিযানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্য ও অ্যালগরিদম যেসব দেশ নিয়ন্ত্রণ করবে, ভবিষ্যতে কৌশলগত ভারসাম্যে তাদের প্রভাবও বেশি থাকবে।

ভারত-চীন সীমান্তের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৈন্যের পরিবর্তে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নজরদারিতে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এআই, রোবোটিক্স ও অপটিক্যাল প্রযুক্তি এখন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান।

এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বোঝাতে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ‘একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে যেমন রান্না করা যায়, তেমনি একটি ঘরও পুড়িয়ে দেওয়া যায়—এআই ঠিক তেমনই।’

তিনি বলেন, এআই সরকারি সেবার মান বাড়াতে পারে। আবার নতুন ঝুঁকি ও বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী হতে হবে।

এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে শুধু কর্মসংস্থান ধরে রাখার জন্য অদক্ষতা টিকিয়ে রাখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন।

তার ভাষায়, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘এআই-সহায়ক সরকার’, ‘মানুষবিহীন সরকার’ নয়। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রেখে গ্রহণযোগ্য ও জনকল্যাণমুখী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। তবে আইন, নীতিমালা, নিরাপত্তা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, জনগণের সম্মতি ও সচেতনতা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে এআই গ্রহণ করতে হবে। এর লক্ষ্য হতে হবে সরকারি সেবার মান বাড়ানো এবং প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, এডব্লিউসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, জি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি এবং আইসিটি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন।

ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট আশফাক জামানও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরে অনুষ্ঠিত হয় উন্মুক্ত আলোচনা।

আলোচনায় এআই গ্রহণের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, এআই নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়নে স্থানীয় চাহিদার ভূমিকা এবং সাইবার কার্যক্রম ও আধুনিক যুদ্ধে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে মতবিনিময় হয়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি, টিই (অব.) সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন।

সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *