প্লাস্টিক বর্জ্যের দায় এবার উৎপাদকদেরও

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ওপর সরাসরি দায়িত্ব চাপিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশিকার ফলে বাজারে প্লাস্টিক পণ্য আনার পর তার ব্যবহার শেষে বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃচক্রায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ১৩ই  আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) বিষয়ক নির্দেশিকা, ২০২৬ প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৩ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে এই নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।

ইপিআর বা ‘এক্সটেন্ডেন্ট প্রোডিউসার রেসপনসিবিলিটি’-এর মূল ধারণা হলো—কোনো পণ্য বাজারে ছাড়ার দায়িত্ব শুধু সেটি উৎপাদন বা বিক্রির মধ্যেই শেষ হবে না। পণ্য ব্যবহারের পর সেটি যে বর্জ্যে পরিণত হয়, সেই বর্জ্যের ব্যবস্থাপনাতেও উৎপাদক বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে।

নতুন নির্দেশিকা বাংলাদেশে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত পুনঃচক্রায়নযোগ্য এবং অ-পুনঃচক্রায়নযোগ্য—উভয় ধরনের প্লাস্টিক পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

এর আওতায় থাকবেন প্লাস্টিক পণ্যের প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক এবং ব্র্যান্ড মালিকরা। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কেবল রপ্তানি আদেশের ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন করে এবং সেই পণ্য দেশের বাজারে না আসে, তাহলে সেই রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্দেশিকার আওতার বাইরে থাকবে।

নির্দেশিকায় প্লাস্টিক পণ্যকে পাঁচটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো—কঠিন প্লাস্টিক, নমনীয় প্লাস্টিক, স্টাইরোফোম বা ইপিএস, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক এবং অন্যান্য প্লাস্টিকজাত পণ্য। শেষ শ্রেণির মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াপার ও সিগারেট ফিল্টারের মতো পণ্যও রয়েছে।

সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে ব্যবস্থার আওতায় না এনে ধাপে ধাপে ‘অবলাইজড এনটিটি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে পরিবেশ অধিদপ্তর।

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম দুই বছরে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরবর্তী দুই বছরে মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পঞ্চম বছরে ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হবে।

তালিকাভুক্ত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন করতে হবে। এই নিবন্ধনের মেয়াদ হবে তিন বছর।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা পালন করতে পারবে। আবার একাধিক প্রতিষ্ঠান মিলে অনুমোদিত প্রোডিউসার রেসপনসিবিলিটি অর্গানাইজেশন (পিআরও)-এর মাধ্যমেও বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃচক্রায়ন ও পরিত্যাজনের ব্যবস্থা করতে পারবে।

নির্দেশিকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রথম দুই বছরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন করতে হবে।

এর পরবর্তী পর্যায়ে এই লক্ষ্য বাড়িয়ে বর্জ্য সংগ্রহের হার ৩০ শতাংশ এবং পুনঃচক্রায়নের হার ১৫ শতাংশ করা হবে।

তবে এসব লক্ষ্য স্থির থাকবে না। তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতে লক্ষ্যগুলো হালনাগাদ করা হবে।

নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করলে সেটিকে এক ধরনের পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকার অনুমোদিত পদ্ধতিতে অতিরিক্ত সংগৃহীত বর্জ্য থেকে অর্জিত ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যাবে।

এর ফলে বর্জ্য সংগ্রহ শুধু পরিবেশগত দায়িত্বের বিষয় না থেকে ব্যবসায়িক প্রণোদনার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেশি বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়তে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় শুধু নিবন্ধন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর তাদের কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

নির্দেশিকার আওতায় নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন নবায়ন না করার বিধান রাখা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করবে। পাশাপাশি জমা দেওয়া তথ্য যাচাই করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান অসত্য তথ্য দিলে তার নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকবে।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় একটি সমস্যা হলো—পণ্য বাজারে আসার পর তার শেষ পরিণতির দায়িত্ব কার, তা দীর্ঘদিন স্পষ্টভাবে উৎপাদনকারী পর্যায়ে নির্ধারিত ছিল না। নতুন ইপিআর কাঠামো সেই দায়কে উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দিকে সরিয়ে দিচ্ছে।

এর ফলে প্লাস্টিক পণ্যের পুরো জীবনচক্রকে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং ব্যবহার শেষে সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়ন—প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, নির্দেশিকাটি বাস্তবায়িত হলে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অ-প্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

এর সঙ্গে চক্রাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি বিকাশের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে—যেখানে ব্যবহারের পর কোনো পণ্যকে সরাসরি ফেলে না দিয়ে তার উপকরণ আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে স্থলভাগের পাশাপাশি নদী, খাল এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেও প্লাস্টিক জমা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। উৎপাদক পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই প্রবাহ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের মতে, নতুন নির্দেশিকা বাংলাদেশের সামুদ্রিক প্লাস্টিক দূষণ কমানোর পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় দেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকেও শক্তিশালী করবে।

তবে নির্দেশিকার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে এর প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। প্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ, নিবন্ধন, বর্জ্যের পরিমাণ নির্ধারণ, সংগ্রহ ও পুনঃচক্রায়নের তথ্য যাচাই এবং ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করাই হবে এর সফলতার অন্যতম শর্ত।

নির্দেশিকার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, নিবন্ধন ফরম ও অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ছক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *