ভুটানের ক্লাব পারো এফসি ২০২৬-২৭ মৌসুমের এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের প্রাথমিক পর্বে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে। ফারাহ এফসিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পরবর্তী ধাপে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে দলটি। আর এই জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার তারিক রায়হান কাজীর নাম।
ফিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া তারিক কাজী ছোটবেলা থেকেই ইউরোপীয় ফুটবল পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ফিনল্যান্ডের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্বও করেছেন তিনি। ২০১৮ সালে ফিনল্যান্ডের ক্লাব ইলভেসের হয়ে উয়েফা ইউরোপা লিগে মাঠে নেমে তিনি একটি বিশেষ কীর্তি গড়েন। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সেই মঞ্চে খেলা প্রথম বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান তারিক।
তবে ইউরোপে গড়ে ওঠা ক্যারিয়ারের মাঝেই তিনি বেছে নেন নিজের শিকড়ের দেশ বাংলাদেশকে। ২০২০ সালে বসুন্ধরা কিংসে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন অধ্যায় শুরু করেন। প্রায় পাঁচ বছর দেশের শীর্ষ ক্লাবটির হয়ে খেলেছেন তিনি। এই সময়ে জিতেছেন একাধিক বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতার শিরোপা। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় দলের রক্ষণভাগেও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০২১ সালে বাংলাদেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়ার পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন তারিক। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় দলের প্রথম পছন্দের ডিফেন্ডারদের একজন।
তবে তার বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবল অধ্যায় সুখকরভাবে শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটে। বকেয়া বেতন পরিশোধ না হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি চুক্তি বাতিল করেন। এরপর কয়েক মাস ক্লাবহীন থাকার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে যোগ দেন ভুটানের চ্যাম্পিয়ন ক্লাব পারো এফসিতে।
নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছেন তারিক। এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পারো এফসির হয়ে মাঠে নেমে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। ফারাহ এফসির বিপক্ষে জয়েও ছিল তার উপস্থিতি।
তারিকের এই সাফল্য বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের জন্য গর্বের বিষয়। কারণ আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতার মঞ্চে একজন বাংলাদেশি ফুটবলারের প্রতিনিধিত্ব দেশের ফুটবলের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
তবে এই গল্পের অন্য একটি দিকও রয়েছে। ইউরোপে বেড়ে ওঠা, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় খেলা এবং বাংলাদেশের জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য একজন ফুটবলার কেন শেষ পর্যন্ত দেশের কোনো ক্লাবে নয়, ভুটানের একটি ক্লাবে নিজের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে বাধ্য হলেন— সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এখানে ভুটানের ফুটবল বা পারো এফসির ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বরং পারো এফসি তারিককে সুযোগ দিয়েছে, তার সামর্থ্যের মূল্যায়ন করেছে এবং নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দলে যুক্ত করেছে। পেশাদার ক্লাব হিসেবে সেটিই তাদের সাফল্য।
প্রশ্নটি বরং বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবল কাঠামো নিয়ে। দেশের অন্যতম সেরা ক্লাবের হয়ে সাফল্য পাওয়া এবং জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তারিক কাজীর মতো একজন খেলোয়াড়কে ধরে রাখার মতো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ কি বাংলাদেশের ক্লাবগুলো তৈরি করতে পেরেছে?
এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে পারো এফসির জয় তাই শুধু একটি ক্লাবের সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন বাংলাদেশি ফুটবলারের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প, একই সঙ্গে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ।
আজকের দিনে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা তারিক কাজীর সাফল্যে গর্বিত হতে পারেন। তবে একই সঙ্গে হয়তো প্রশ্নটিও মনে রাখতে হবে— দেশের প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিজেদের ঘরে ধরে রাখার মতো পরিবেশ বাংলাদেশ কবে তৈরি করতে পারবে?