যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে আলফা-গ্যাল সিনড্রোমের ঝুঁকি

ডাঃ মশিউর রহমান মোল্লা

বন-জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে একটি টিকের কামড়। ঘটনাটি হয়তো তখন তেমন গুরুত্বই পেল না। কিন্তু কয়েক মাস পর গরু বা শূকরের মাংস খাওয়ার পর শুরু হলো পেটব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট কিংবা শরীরে চাকা ওঠা। কখনো আবার মাংস খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন একজন মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রে এমন অদ্ভুত ধরনের অ্যালার্জির ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর নাম আলফা-গ্যাল সিনড্রোম । এটি সাধারণ খাদ্য অ্যালার্জির মতো নয়। একটি নির্দিষ্ট ধরনের টিকের কামড়ের পর শরীর স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহে থাকা একটি শর্করার বিরুদ্ধে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। এরপর গরু, শূকর বা ভেড়ার মাংসসহ কিছু প্রাণিজ পণ্য খেলে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আলফা-গ্যালের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি বহনকারী মানুষের হার উল্লেখযোগ্য বলে পাওয়া গেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন ( সিডিসি)-এর মর্বিডিটি এন্ড মর্টালিটি উইকলি রিপোর্ট -এ।

আলফা-গ্যাল বা গ্যালাক্টোজ-আলফা-১,৩-গ্যালাক্টোজ হলো এক ধরনের শর্করা। এটি মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবে থাকে না, কিন্তু গরু, শূকর, ভেড়ার মতো অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহে পাওয়া যায়।

কিছু ক্ষেত্রে টিকের কামড়ের মাধ্যমে এই শর্করা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটিকে ক্ষতিকর বস্তু হিসেবে চিনতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তির শরীরে আলফা-গ্যালের বিরুদ্ধে IgE অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। তখন আলফা-গ্যালযুক্ত খাবার বা কিছু প্রাণিজ পণ্যের সংস্পর্শে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে Lone Star tick-এর সঙ্গে এই অ্যালার্জির সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে আলফা-গ্যাল সিনড্রোম শুধু একটি নির্দিষ্ট টিকের কামড়ের সঙ্গে সীমাবদ্ধ—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রেই নিশ্চিত নয়।

আলফা-গ্যাল সিনড্রোমের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিক্রিয়া অনেক সময় তাৎক্ষণিক হয় না।

সাধারণ খাবারের অ্যালার্জিতে খাবার খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিন্তু আলফা-গ্যাল সিনড্রোমে প্রতিক্রিয়া শুরু হতে প্রায় ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

ফলে একজন মানুষ রাতের খাবারে গরুর মাংস খেয়ে গভীর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। তখন খাবারের সঙ্গে অসুস্থতার সম্পর্কটি সহজে বোঝা যায় না।

উপসর্গও ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা হতে পারে। কারও শরীরে চাকা উঠতে পারে বা তীব্র চুলকানি হতে পারে। আবার কারও প্রধান সমস্যা হতে পারে পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া কিংবা বমি ভাব।

গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং অ্যানাফাইল্যাক্সিসের মতো জীবনঘাতী প্রতিক্রিয়াও হতে পারে।

সিডিসি-সমর্থিত সাম্প্রতিক গবেষণায় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ৩,০০০ রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আলফা-গ্যালের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি বহনকারী মানুষের হার বিশেষভাবে বেশি পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি হার দেখা যায় আরকানসাস ও মিসৌরিতে। কেন্টাকি, টেনেসি ও ভার্জিনিয়াতেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সংবেদনশীলতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তে আলফা-গ্যালের অ্যান্টিবডি পাওয়া মানেই ওই ব্যক্তি আলফা-গ্যাল সিনড্রোমে আক্রান্ত—এমন নয়।

কারও শরীরে আলফা-গ্যালের বিরুদ্ধে IgE অ্যান্টিবডি থাকতে পারে, কিন্তু তিনি কোনো উপসর্গ নাও অনুভব করতে পারেন। তাই শুধু রক্ত পরীক্ষার ফল দিয়ে রোগ নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের কাছে রোগীর উপসর্গ, টিকের কামড়ের ইতিহাস এবং পরীক্ষার ফল—সবকিছু মিলিয়ে রোগ নির্ণয় করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় টিকের বিস্তার রয়েছে। উষ্ণ আবহাওয়া, বন ও ঝোপঝাড়ে মানুষের বেশি চলাচল এবং টিকের বিস্তারের মতো বিষয়গুলো এই ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

যারা নিয়মিত বন, ঘাসভূমি বা ঝোপঝাড়ের এলাকায় কাজ করেন কিংবা সময় কাটান, তাদের টিকের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বেশি।

বাইরে ঘোরাফেরা করা পোষা প্রাণীর মাধ্যমেও টিক বাড়িতে আসতে পারে। তাই শুধু বনভূমিতে যাওয়া মানুষই নয়, পোষা প্রাণীর মালিকদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

মাংস খেলেই কি প্রতিবার অ্যালার্জি হবে?

অবশ্যই নয়। এটাই আলফা-গ্যাল সিনড্রোমকে আরও বিভ্রান্তিকর করে তোলে।

একজন ব্যক্তি কোনো দিন মাংস খেয়ে স্বাভাবিক থাকতে পারেন, আবার অন্য কোনো দিন একই ধরনের খাবার খাওয়ার পর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।

খাবারের পরিমাণ, খাবারে থাকা চর্বির পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক পরিস্থিতির মতো বিভিন্ন বিষয় প্রতিক্রিয়ার তীব্রতায় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কোনো একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে রোগটি বোঝা কঠিন।

আলফা-গ্যাল সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি শুধু স্টেক, বার্গার বা অন্য কোনো লাল মাংস এড়িয়ে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে তৈরি অন্যান্য পণ্যও সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন—লার্ড, জেলাটিন বা নির্দিষ্ট প্রাণিজ উপাদানযুক্ত খাবার ও পণ্য।

এমনকি কিছু ওষুধ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত পণ্যেও স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে পাওয়া উপাদান থাকতে পারে। তবে কোন পণ্য একজন রোগীর জন্য নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অযথা সব ধরনের পণ্য বাদ দেওয়াও ঠিক নয়।

আলফা-গ্যাল সিনড্রোমের জন্য বর্তমানে এমন কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, যা অ্যালার্জিটি স্থায়ীভাবে নির্মূল করে দেয়।

রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো যেসব খাবার বা পণ্যে প্রতিক্রিয়া হয় সেগুলো শনাক্ত করে এড়িয়ে চলা এবং ভবিষ্যতে টিকের কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।

যাদের গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে, চিকিৎসক তাদের ইপিনেফ্রিন অটো-ইনজেক্টর সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিতে পারেন। এটি জরুরি অবস্থায় অ্যানাফাইল্যাক্সিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

তবে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে কী কী খাবার বা পণ্য এড়িয়ে চলতে হবে, সেটি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

আলফা-গ্যাল সিনড্রোমের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি হলো টিকের কামড় এড়ানো।

বন, ঝোপঝাড় বা লম্বা ঘাসের এলাকায় গেলে—

  • লম্বা প্যান্ট ও হাতাযুক্ত পোশাক পরা;
  • প্রয়োজন অনুযায়ী টিক প্রতিরোধক রিপেলেন্ট ব্যবহার করা;
  • বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর শরীর ও পোশাক পরীক্ষা করা;
  • পোষা প্রাণীর শরীরে টিক আছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করা;
  • সম্ভব হলে টিকের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ঘন ঝোপঝাড় ও লম্বা ঘাস এড়িয়ে চলা

উপকারী হতে পারে।

কেউ যদি টিকের কামড়ের পর কয়েক মাস ধরে বারবার খাবার খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর অস্বাভাবিক পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, চুলকানি, শরীরে চাকা ওঠা বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন, তাহলে বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

বিশেষ করে টিকের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস থাকলে আলফা-গ্যাল সিনড্রোমের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে শুধু “মাংস খেলে পেট খারাপ হয়”—এমন উপসর্গের ভিত্তিতে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি মূল্যায়ন করবেন।

একটি টিকের কামড়ের সঙ্গে কয়েক মাস পরের রাতের খাবারের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আর এ কারণেই আলফা-গ্যাল সিনড্রোমকে অনেক সময় শনাক্ত করতে দেরি হয়।

নতুন গবেষণা অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে আলফা-গ্যালের সংবেদনশীলতা আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তবে অ্যান্টিবডি বহনকারী মানুষের সংখ্যা এবং প্রকৃত রোগীর সংখ্যা এক নয়—এই পার্থক্যটিও মনে রাখা জরুরি।

টিকের বিস্তার এবং মানুষের সঙ্গে টিকের সংস্পর্শ যত বাড়বে, চিকিৎসকদের জন্য এই অ্যালার্জি সম্পর্কে সচেতন থাকা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একটি ছোট্ট টিকের কামড় যে একজন মানুষের খাবারের অভ্যাস, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত বদলে দিতে পারে—আলফা-গ্যাল সিনড্রোম তারই একটি অস্বাভাবিক উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *