নড়াইলে এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইলে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে শিল্পী এস এম সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, নড়াইল এবং জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সোমবার (১০ই  আগস্ট) এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

সকালে এস এম সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালা ও শিশু স্বর্গ এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয় জন্মবার্ষিকীর আয়োজন। কর্মসূচির মধ্যে ছিল স্থানীয় ২০ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে আর্টক্যাম্প, শিশু স্বর্গের তিন শতাধিক শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন উৎসব ও প্রদর্শনী, ‘সুলতান সম্মাননা পদক ২০২৬’ প্রদান, এস এম সুলতানের জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম এমপি, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান এমপি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ, নড়াইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর-ই-আলম সিদ্দিকী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক এবং এস এম সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালা ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সভাপতি ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক আব্দুল হালিম চঞ্চল। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, এস এম সুলতান শুধু নড়াইল বা পদ্মাপারের মানুষের শিল্পী নন; তিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বের একজন অনন্য চিত্রশিল্পী।

তিনি বলেন, এস এম সুলতানের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ছোট ছোট স্কুলের শিশু এবং গ্রামের ছেলে-মেয়েদের চিত্রকর্ম ও শিল্পচর্চায় উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করা গেলে পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্পচর্চার মাধ্যমে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটবে।

এ বছর থেকে ‘সুলতান সম্মাননা পদক প্রদান’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে স্কুলভিত্তিক আয়োজনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, এস এম সুলতান বাংলাদেশের সবচেয়ে মানবঘনিষ্ঠ ও জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পীদের একজন। কৃষিভিত্তিক সভ্যতাকে চিত্রকলায় তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য।

তিনি বলেন, এস এম সুলতান নড়াইলের যেমন গৌরব, তেমনি বৃহত্তর যশোর, বাংলাদেশ এবং বিশ্বেরও গৌরব। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুলতানের শিশু স্বর্গে বেড়ে ওঠা শিশুরাও ভবিষ্যতে বড় শিল্পী হয়ে উঠবে।

এবারের আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ‘সুলতান সম্মাননা পদক ২০২৬’ প্রদান। বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চায় দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য শিল্পসাধনা, সৃজনশীলতা এবং দেশের শিল্পাঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শিল্পী, গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ছাপচিত্র শিল্পী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সাত্তারকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ‘এস এম সুলতান: জীবন ঘনিষ্ঠ ও সমাজ বাস্তবতার শিল্পী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ও শিল্পী রেজা আসাদ আল হুদা অনুপম।

আলোচনায় এস এম সুলতানের শিল্পভাবনা, মানুষের জীবন ও সমাজবাস্তবতার সঙ্গে তাঁর শিল্পের সম্পর্ক এবং কৃষিজীবী মানুষের জীবনকে চিত্রকলায় তুলে ধরার বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়।

জন্মবার্ষিকীর আয়োজনের অংশ হিসেবে স্থানীয় ২০ জন শিল্পীকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আর্টক্যাম্প। পাশাপাশি শিশু স্বর্গের তিন শতাধিক শিশু-কিশোর অংশ নেয় চিত্রাঙ্কন উৎসবে। তাদের আঁকা ছবি নিয়ে আয়োজন করা হয় প্রদর্শনীও।

এস এম সুলতান শিশুদের শিল্পচর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিশু স্বর্গে শিশু-কিশোরদের শিল্পচর্চার সুযোগ তৈরি করা সেই ভাবনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা। জন্মবার্ষিকীর আয়োজনে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে সামনে আনা হয়।

দিনব্যাপী কর্মসূচির শেষ পর্বে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিল্প, শিশুদের সৃজনশীলতা, আলোচনা এবং সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে নড়াইলে পালিত হয় এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *