মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপে ফেলার জন্য এক অস্বাভাবিক ও অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের একাধিক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে ইমেইলের মাধ্যমে ‘সৃজনশীল ও অপ্রচলিত’ উপায়ে ইরানকে শাস্তি দেওয়ার নতুন কৌশল চেয়েছেন। প্রচলিত সামরিক হামলায় ইরানকে নমনীয় করা যায়নি—এই স্বীকারোক্তিরই ইঙ্গিত বহন করে এই পদক্ষেপ।
সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানকে তার শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার ইরানের সক্ষমতা খর্ব করা। কিন্তু এসব প্রচলিত ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান সত্ত্বেও তেহরানের নমনীয় হবার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
সামরিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, কেবল মিসাইল ও বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানের মাটির গভীরে থাকা সুসংহত সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে স্থলভাগে মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এটি একটি বিশাল ঝুঁকি, যা নেওয়ার ঔচিত্য নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন রয়েছে। ইতিমধ্যে এই সংঘাতে ১৮ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন, যা হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করেছে।
সামরিক ইতিহাসে এমন নজির বিরল, যেখানে ইমেইলের মাধ্যমে এত বিস্তৃত পরিসরে বিশ্লেষকদের কাছে কৌশলগত পরামর্শ চাওয়া হয়। সেন্টকম-এর গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা বুধবার এক ইমেইলে লিখেছেন, “আমরা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নতুন ও সৃজনশীল উপায় খুঁজছি।”
এই বিষয়ে সেন্টকম-এর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, “মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের উদ্ভাবনীভাবে চিন্তা ও কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অ্যাডমিরাল কুপার সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপারেশনাল দক্ষতা অর্জনের জন্য পদবি নির্বিশেষে আমাদের দলের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।”
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের আবেদন প্রচলিত সামরিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। সেন্টকম বর্তমান কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কিত আলোচনার সাথে পরিচিত একজন সূত্র মন্তব্য করেছেন, “প্রচলিত বিকল্পগুলো যখন ফুরিয়ে আসে, তখন সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন হয়। দিনশেষে প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি চান, তাই তিনি কঠোর অবস্থান দেখিয়েও কীভাবে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, তার উপায় খুঁজছেন।”
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অস্বাভাবিক আবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রচলিত যুদ্ধকৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর ‘অপ্রচলিত’ পথে হাঁটতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। ইরানের পারমাণবিক বা সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধের কঠোরতর রূপ, নাকি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি—কোন পথে যে হাঁটবে যুক্তরাষ্ট্র, তা এখন পর্যবেক্ষকদের জন্য বড় প্রশ্ন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, ওয়াশিংটন এখন এমন সব বিকল্পের সন্ধানে, যা আগে কখনো বিবেচনাই করা হয়নি।