‘ককরোচ ডেমোক্রেসি’ – যেভাবে নিরস্ত্র তরুণ প্রজন্ম ফিরিয়ে আনছে গণতন্ত্রের মর্যাদা

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী আরুন্ধতী রায় সম্প্রতি ‘দ্য ওয়্যার’-এ প্রকাশিত তাঁর “ককরোচ ডেমক্রেসি: আনআর্মড এন্ড ডেঞ্জারাস” (ককরোচ ডেমোক্রেসি: নিরস্ত্র কিন্তু বিপজ্জনক) শীর্ষক প্রবন্ধে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের এক অনন্য বিদ্রোহের চিত্র তুলে ধরেছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ -র আন্দোলনকে তিনি শুধু একটি প্রতিবাদই নয়, বরং গণতন্ত্রের মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেকার তরুণদের উদ্দেশ্যে করা একটি অবমাননাকর মন্তব্যের (যেখানে তিনি তাদের ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ-এর সাথে তুলনা করেছিলেন) প্রতিবাদে বোস্টনে বসবাসরত ছাত্র অভিজিৎ দীপকে ইনস্টাগ্রামে প্রশ্ন তোলেন, “যদি সব তেলাপোকা একজোট হয়?” এই ডাকে সাড়া দিয়ে লক্ষাধিক তরুণ অনলাইনে সরব হন এবং এর জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র।

এই আন্দোলনের প্রাথমিক ও সবচেয়ে জোরালো দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫২টি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এই ফাঁসের ফলে বছরের পর বছর পড়াশোনা করা লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে; অনেকের পরিবারকে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে। সম্প্রতি নীট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ১২ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন।

অনলাইনে ক্ষোভ যখন ‘সুনামি’-র রূপ নেয়, তখন অভিজিৎ দীপকে ৬ই  জুন ভারতে ফিরে সরাসরি দিল্লির জন্তর মন্তরে পৌঁছান। তাঁর সাথে যোগ দেন লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষা কর্মী ও আন্দোলনকারী সোণাম ওয়াংচুক, যিনি অনশন শুরু করেন। তাঁকে সমর্থন জানিয়ে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-র ছাত্ররাও অনশনে বসেন।

২০শে জুলাই, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সংসদের দিকে এক বিশাল মিছিলের ডাক দেয়। পুলিশ সোণাম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করলেও, তরুণদের এই মিছিল থামানো যায়নি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ট্রেন, বাস এবং মেট্রোয় করে জন্তর মন্তরে জড়ো হন।

আরুন্ধতী রায় তাঁর প্রবন্ধে সরকার ও পুলিশের দমনমূলক কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মিছিলের আগে পুলিশ প্রধানকে গোপনে পরিবর্তন করা, ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত করার চেষ্টা এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স -এর মোতায়েন সত্ত্বেও তরুণরা পিছু হটেনি। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং নিরস্ত্র ছাত্রদের লক্ষ্য করে একে-৪৭ রাইফেল তাক করে রাখা হলেও, মিছিলকারীরা অহিংস ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে এগিয়ে যায়। রায়ের ভাষায়, এই মুহূর্তে সরকার তার ‘মখমলের গ্লাভস’ খুলে ফেলেছে এবং তার পেছনে থাকা ‘ফ্যাসিবাদী লৌহ মুষ্টি’ উন্মোচিত হয়েছে।

প্রবন্ধে আরুন্ধতী রায় স্পষ্ট করেছেন যে, এই আন্দোলন এখন শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো শাসনব্যবস্থার শীর্ষ থেকে তলদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা পচন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক প্রজন্মের রোষ। তিনি ২০১১ সালের অ্যান্না হাজারে আন্দোলনের সাথে এর তুলনা টেনে বলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর পেছনে কোনো কর্পোরেট মিডিয়া বা সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের হাত নেই; এটি সম্পূর্ণভাবে তরুণ প্রজন্ম এবং ইন্টারনেটের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

তবে তিনি সতর্কও করেছেন যে, এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ টিকিয়ে রাখতে হলে প্রকৃত রাজনৈতিক কাজ শুরু করতে হবে এবং বিরোধী দলগুলোর ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্ব ভুলে একজোট হতে হবে। সরকার জানে যে বিরোধীরা সহজে এক হতে পারবে না, তাই তারা অপেক্ষা করার কৌশল নিচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই অপেক্ষার সময় নেই।

“ককরোচ ডেমোক্রেসি: নিরস্ত্র কিন্তু বিপজ্জনক” প্রবন্ধের মূল বার্তা হলো— ভয়ের সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে তরুণ প্রজন্ম তাদের নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার যে সাহস দেখিয়েছে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন আশার আলো। আরুন্ধতী রায়ের ভাষায়, “একবার একজন প্রধানমন্ত্রী শারীরিকভাবে পালিয়ে গেলে, রাজনৈতিকভাবে পালানোও আর বেশি দেরি নয়।”

তবে এই পরিবর্তন সহজে আসবে না। সরকার এই চ্যালেঞ্জ সহ্য করবে না এবং দমননীতি আরও কঠোর হতে পারে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা চুপ থাকবে না। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে আদিবাসী ও পরিবেশ আন্দোলনের সাথে মিলে এই ‘ককরোচ’ শক্তিই হয়তো ভারতকে এই গণতান্ত্রিক সংকট থেকে বের করে আনার পথ দেখাতে পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *