রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন । তার পদত্যাগ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে।

২০২৪ সালের ৫ই  আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ আয়োজন ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব।

তবে একই সময় থেকে তাকে আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

২০২৪ সালের শেষভাগ থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জোরালো হতে শুরু করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন বঙ্গভবন ঘেরাওসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। তাদের দাবি ছিল, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদেও পরিবর্তন প্রয়োজন।

এই দাবির পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতির একটি বক্তব্য।

২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই।

এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্যটির সমালোচনা করেন। কেউ কেউ একে সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন।

এরপর থেকেই তার পদে থাকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাষ্ট্রপতি ও সরকারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ছিল।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন প্রকাশ্যে বলেন, সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি জানান, সরকার প্রয়োজন মনে করলে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে প্রস্তুত।

জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পদত্যাগের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

অন্যদিকে, সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি থাকে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়। এটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার অংশ।

গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তন, সংসদ বিলুপ্তি, অন্তর্বর্তী সরকার এবং নতুন জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রপতির পদেও পরিবর্তন হলে সেই প্রক্রিয়া আরও পূর্ণতা পাবে বলে অনেকে মনে করছেন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো নিজেদের মনোনীত একজনকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পাবে। এটি দলটির জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলেরও নজরে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন হলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর এখন সবার নজর  নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকে।

কে হচ্ছেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, তিনি কী ধরনের সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করবেন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ভূমিকা কীভাবে নতুনভাবে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *