ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইকোনমিস্ট গত ১৩ জুলাই একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার শিরোনাম — “ইজ অং সান সু চি ডেড ?” (আউং সান সু চি কি মৃত?)। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের কারাবন্দী গণতান্ত্রিক নেত্রী সু চি ২০২২ সালের শেষের দিকে তার বিচার শেষ হওয়ার পর থেকে কাউকে দেখা দেননি। তার সর্বশেষ সরকারি ছবি তোলা হয়েছিল ২০২১ সালের ২৪শে মে, আদালতে হাজির হওয়ার সময়।
- সু চির বয়স: ৮১ বছর (জন্ম: ১৯শে জুন ১৯৪৫)
- শেষবার সর্বসাধারণের সামনে দেখা গেছে: ২০২২ সালের শেষ দিকে
- বর্তমান অবস্থান: অজানা
- সাজা: ৩৩ বছর (পরে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়)
- প্রিয় কুকুর তাকিয়োর মৃত্যু: ২১শে জুন ২০২৬
সু চির ছোট ছেলে কিম আরিস (হতে লিন) লন্ডনে বসে তার মায়ের বেচে থাকার প্রমাণ দাবি করছেন। তিনি বলেছেন, তার মায়ের গুরুতর হৃদরোগ রয়েছে এবং তিনি একজন কার্ডিওলজিস্ট দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে অনুমতি পাননি। কিম আরিস বলেন, “আমার অনুরোধ খুবই সরল: আমার মা বেঁচে আছেন, তার প্রমাণ দেখান, এবং তাকে মুক্তি দিন।”
কিম আরিস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “প্রুফ অফ লাইফ “ ক্যাম্পেইন চালু করেছেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারির সেনা অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগে তার মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। এরপর তিনি মাত্র একটি চিঠি পেয়েছেন। আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দাবি করছে, সু চি “ভালো আছেন” এবং তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত ১২ই জুলাই আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সু চির স্বাস্থ্য ভালো। তবে এই দাবির কোনো সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
গত ৩০শে এপ্রিল, জান্তা ঘোষণা করে যে সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দী করা হয়েছে। সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়, যেখানে সাদা পোশাক পরা সু চি একটি বেঞ্চে বসে আছেন। কিন্তু ছবিটি কবে এবং কোথায় তোলা হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হতে পারে একটি পুরনো ছবি।
দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে সু চির প্রিয় কুকুর তাকিয়ো কে নিয়ে। এই কুকুরটি সু চিকে সবখানে অনুসরণ করত। কিন্তু সেনা অভ্যুত্থানের পর সু চিকে কারাগারে নেওয়া হলে তাকিয়োকে তাঁর সঙ্গে যেতে দেওয়া হয়নি। তাকিয়ো, মালিকের ফেরার অপেক্ষায় ইয়াংগুনের ৫৪ নম্বর ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতেই থেকে যায় । ২১শে জুন ২০২৬, ১৬ বছর বয়সে তাকিয়ো মারা যায়।
এই কুকুরের মৃত্যু একটি প্রতীকী ঘটনা। যেমন তাকিয়ো তার মালিকের ফেরার অপেক্ষায় মারা গেছে, তেমনি মিয়ানমারের কোটি কোটি মানুষ তাদের নেত্রীর ফেরার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু সেই ফেরা কি হবে?
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সু চিকে গৃহবন্দী করাকে “রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে একটি অর্থবহ পদক্ষেপ“ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি দাবি করেছেন।
ব্রিটেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ বলেছেন, “সু চিকে মুক্তি দেওয়ার সময় অনেক আগেই এসেছে। এটি একটি নৈতিক ও মানবিক জরুরি বিষয় যে তাকে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হোক।”
তবে মিয়ানমারের বিরোধী দল ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) বলছে, জান্তার এই পদক্ষেপ কেবল “পাবলিক রিলেশন্সের কৌশল”। তারা মনে করে, সেনাবাহিনী ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এই ছলচাতুরি করছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর থেকে ২২,০৪৭ জনেরও বেশি মানুষ রাজনৈতিক কারণে আটক হয়েছেন।
জান্তা আগামী ২৮শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে, যা সমালোচকদের দৃষ্টিতে কেবলি একটি “নাটক”। দেশের মাত্র ৩০% এলাকা জান্তার নিয়ন্ত্রণে আছে। সু চি ও তার দল এনএলডি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রশ্নটি এখনো উত্তরহীন — “আউং সান সু চি কি মৃত?” কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। জান্তা বলছে তিনি ভালো আছেন, কিন্তু কোনো প্রমাণ দিচ্ছে না। তার ছেলে বলছেন, তিনি মারা গেছেন কিনা তা জানতে চান। বিশ্ববাসী বলছে, সু চির বেচে থাকার প্রমাণ দেখানো হোক।
সু চি জীবিত থাকুন বা মৃত, তিনি মিয়ানমারের ইতিহাসে এক অম্লান প্রতীক। ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতা এই নারী একদিন গোটা বিশ্বের আশার আলো ছিলেন। আজ তিনি একটি রহস্য — একটি জাতির অন্তর্ধানের প্রতীক।