এক সময় পশ্চিম আফ্রিকার গণতন্ত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল সেনেগাল। প্রতিবেশী মালি, বুর্কিনা ফাসো ও নাইজারে যখন সামরিক অভ্যুত্থান এবং জঙ্গি সহিংসতা বাড়ছিল, তখন সেনেগালকে দেখা হতো স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নিয়মিত নির্বাচন এবং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সফল মডেল হিসেবে।
কিন্তু এখন সেই দেশই ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সালের আমলে গোপনে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের তথ্য প্রকাশের পর দেশটির অর্থনীতি, রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমাই ফায়ে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সরকারের আর্থিক হিসাবের স্বাধীন নিরীক্ষার নির্দেশ দেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সেই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সরকার প্রায় ৭ থেকে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ নিয়েছিল, যার বড় অংশই সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এর ফলে সেনেগালের সরকারি ঋণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৫ শতাংশের নিচে থেকে বেড়ে ১৩২ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় ঋণের বোঝা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ঋণ গ্রহণ ও সরকারি ব্যয়ের প্রকৃত তথ্য সংসদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এই ঘটনায় শুধু সেনেগালের আগের সরকারের ভূমিকাই নয়, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকেই আইএমএফ সেনেগালের ঋণ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতির ইঙ্গিত পেয়েছিল। এরপরও ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংক ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা অনুমোদন করে এবং আইএমএফ প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি চালু করে। এর একটি অংশ দ্রুত ছাড়ও করা হয়।
অনেক বিশ্লেষকের প্রশ্ন, সেনেগাল তখন পশ্চিমা দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্র হওয়ায় কি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি উপেক্ষা করেছিল?
ঋণ সংকট এখন দেশের নতুন নেতৃত্বকেও বিভক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমাই ফায়ে মনে করেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণ পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী উসমান সোনকো শুরু থেকেই আইএমএফের কঠোর শর্তের বিরোধিতা করেন। তার মতে, এই ধরনের চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করবে।
এই মতবিরোধ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট ফায়ে প্রধানমন্ত্রী সোনকোকে পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরে সোনকো সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং আইনসভায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন।
ফলে বর্তমানে সেনেগালে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এতে বাজেট অনুমোদন, ঋণ পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম কমানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। কিছু সরকারি কর্মচারীর বেতন দিতে বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি পেনশন ও জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এসব পদক্ষেপ জনগণের অসন্তোষ বাড়াতে পারে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
পশ্চিম আফ্রিকায় সেনেগালের গুরুত্ব শুধু তার অর্থনীতির কারণে নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলটির বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সেনেগাল ছিল গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অন্যতম প্রতীক। যদি এই সংকটের কারণে সেনেগালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে পুরো পশ্চিম আফ্রিকায় এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া সাহেল অঞ্চলে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোও এ ধরনের অস্থিরতার সুযোগ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সেনেগালের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু কঠোর ব্যয়সংকোচন যথেষ্ট হবে না। তাদের মতে, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের উচিত সেনেগালের ঋণের একটি অংশ পুনর্গঠন বা মওকুফ করার বিষয়টি বিবেচনা করা। তবে এর সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর জবাবদিহি। গোপন ঋণের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
সেনেগাল আজ শুধু অর্থনৈতিক সংকটের মুখে নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে।
একদিকে বিপুল ঋণের বোঝা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিভাজন এবং জনগণের বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে দেশটি একটি কঠিন সময় পার করছে। তবু অনেক বিশ্লেষকের বিশ্বাস, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সেনেগাল এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।
কারণ সেনেগালের ভবিষ্যৎ এখন শুধু একটি দেশের প্রশ্ন নয়; এটি পশ্চিম আফ্রিকায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।