জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সোমবার (৭ই জুলাই) বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির ইন্টেরিয়র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভী।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মাদক ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা, পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনার শুরুতে সালাহউদ্দিন আহমদ চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ওই সফরের ধারাবাহিকতায় মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন ইতিহাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ায় জনগণের যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
বৈঠকে পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মানবিক সংকটও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রয়োজনীয় পারিবারিক নথি বা ‘ফ্যামিলি ট্রি’ না থাকায় অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দেশটির কম্পিউটারাইজড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড (সিএনআইসি) পেতে জটিলতায় পড়ছেন। এর ফলে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানান।
নগর নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের ৪০টির বেশি শহরে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের তৎকালীন সিনিয়র স্বরাষ্ট্র সচিব, বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচির সেফ সিটি প্রকল্প পরিদর্শন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পাকিস্তানের কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণেও পাকিস্তানের সহযোগিতা কামনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি বলেন, অতীতে সৌদি আরবে অবস্থানরত অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক ও আঞ্চলিক সংকটে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধিতে পাকিস্তানের ধারাবাহিক সমর্থন প্রত্যাশা করেন, যাতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়।
বৈঠকে পাকিস্তানের ইন্টেরিয়র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সুবিধাজনক সময়ে সফর করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।