জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর জীবন, সাহিত্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বিদ্রোহী দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঠচক্র আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা। বইপড়া, সাহিত্যচর্চা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়।
শনিবার (৪ঠা জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা নগরীর গর্জনখোলা এলাকায় গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগার। এতে সার্বিক সহযোগিতা করে গ্লোবাল ইউনিক একাডেমি ও উৎস খেলাঘর, কুমিল্লা।
অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাহিত্যপ্রেমী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। আয়োজনে ছিল পাঠচক্র, নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং মুক্ত আলোচনা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির অধ্যক্ষ উত্তম বহ্নি সেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একাডেমির প্রভাষক মালবিকা দে।
প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রাহ্মণপাড়া আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গৌরাঙ্গ দাস। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজসেবক মো. জাহাঙ্গীর আলম হাজারী, অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার এবং সোনালী ব্যাংকের কুমিল্লা জাঙ্গালীয়া ওয়াদা শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার অর্পণ পাল।
অনুষ্ঠানে নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করেন গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেবোত্তম বহ্নি সেন। তিনি নজরুলের শৈশবের সংগ্রাম, সাহিত্যজীবনের সূচনা, বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে তাঁর অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। উপস্থাপনার সময় শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে অংশ নেয় এবং পরে অনুষ্ঠিত কুইজ প্রতিযোগিতায়ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
সভাপতির বক্তব্যে উত্তম বহ্নি সেন বলেন, বইপড়ার বিকল্প নেই। বর্তমান প্রজন্মকে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যচর্চা এবং জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন প্রয়োজন। তিনি বলেন, নজরুল কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানবতা, সাম্য, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতারও কবি। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শ পৌঁছে দেওয়াই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রধান অতিথি গৌরাঙ্গ দাস বলেন, নজরুল বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর সাহিত্য শুধু কাব্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবমুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী ভাষা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে নজরুলকে জানার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথিরা বলেন, বইপড়ার অভ্যাস মানুষের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে এবং একটি মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁদের মতে, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশে সহায়ক হবে।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা করে। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর রচিত প্রায় চার হাজার গান আজ ‘নজরুলগীতি’ নামে বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম মূল্যবান সম্পদ।
বক্তারা নজরুলের জীবনসংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন। ১৮৯৯ সালের ২৪শে মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন। মক্তবে শিক্ষকতা, মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন, রুটির দোকানে কাজ এবং পরে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় নীরব জীবন কাটালেও তাঁর সাহিত্য ও সংগীত আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতেও জাতীয় কবি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।