আনোয়ার পারভেজ
তাইওয়ানে এখন একটি ব্যতিক্রমী সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দেশটিতে পোষা কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম দেখায় এটি পশুপ্রেমের একটি ইতিবাচক চিত্র মনে হতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যাবিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জন্মহার কমে যাওয়া, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং পরিবর্তিত জীবনধারার মতো গভীর সামাজিক বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাইওয়ানে নিবন্ধিত পোষা কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ। একই সময়ে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৯ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ, প্রথমবারের মতো শিশুদের তুলনায় পোষ্য প্রাণীর সংখ্যা বেশি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বহু বছর ধরে তাইওয়ানে জন্মহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সঙ্গে বাড়ছে একক জীবনযাপন, দেরিতে বিয়ে এবং সন্তান না নেওয়ার প্রবণতা। ফলে অনেক মানুষ পরিবারের সদস্যের মতো করে পোষ্য প্রাণী লালন-পালন করছেন।
তাইওয়ান বিশ্বের সর্বনিম্ন জন্মহারের দেশগুলোর একটি। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়ির দাম, শিক্ষার খরচ এবং কর্মক্ষেত্রের চাপ অনেক তরুণ-তরুণীকে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অনেক দম্পতির মতে, একটি সন্তান বড় করতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানসিক দায়িত্ব নিতে হয়। তুলনামূলকভাবে একটি পোষ্য প্রাণীর যত্ন নেওয়া সহজ। পাশাপাশি এটি একাকীত্ব কমায় এবং মানসিক সঙ্গ দেয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, কর্মজীবন এবং জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবার গঠনের ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে।
পোষ্য প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাইওয়ানে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে পোষ্যসেবা খাত। এখন দেশটিতে পোষ্য হাসপাতাল, গ্রুমিং সেন্টার, হোটেল, ক্যাফে, ডে-কেয়ার এবং বিশেষায়িত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য পোষ্য-সংশ্লিষ্ট সুবিধাও চালু করেছে। ফলে পোষ্য শিল্প এখন তাইওয়ানের অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য খাতে পরিণত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পোষ্য শিল্পের সম্প্রসারণ ইতিবাচক হলেও এটি জনসংখ্যা সংকটের বিকল্প নয়।
শিশুর সংখ্যা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি সংকুচিত হবে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে। স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ও বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তাইওয়ানের জনসংখ্যা ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো কমতে শুরু করে। এরপর থেকে নিম্ন জন্মহার দেশটির অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
জন্মহার বাড়াতে তাইওয়ান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সন্তান জন্মে আর্থিক সহায়তা, শিশুর পরিচর্যা ভাতা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিশু পরিচর্যা সুবিধা সম্প্রসারণ।
তবে এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। গবেষকদের মতে, শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য, সাশ্রয়ী আবাসন এবং শিশু লালন-পালনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা একক নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, স্পেনসহ অনেক দেশেই জন্মহার দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। এসব দেশে পোষ্য প্রাণী পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হলেও জনসংখ্যা হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জনসংখ্যাবিদরা মনে করেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশের সামনে আগামী কয়েক দশকে একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
তাইওয়ানের এই পরিবর্তন কেবল পোষ্য প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি সমাজের পরিবর্তিত মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনসংখ্যাগত রূপান্তরের প্রতিফলন।
পোষ্য প্রাণী মানুষের জীবনে আনন্দ ও মানসিক স্বস্তি এনে দেয়। তবে একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নতুন প্রজন্মের ওপর। তাই জন্মহার কমে যাওয়ার প্রবণতা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি গ্রহণই এখন তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। পরিবার, কর্মজীবন ও জীবনমানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে জনসংখ্যা সংকট আগামী দিনে আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।