তাপস চন্দ্র সরকার
“মানুষের জীবনটা আসলে একটা খাতার মতো। পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে কখন যে শেষ পাতায় চলে আসে, মানুষ নিজেও টের পায় না।” চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাসের জীবনের খাতাটাও যেন আজ তেমনি এক পরম পূর্ণতার শেষ পাতায় এসে পৌঁছাল। দীর্ঘ ৩৮ বছর ৮ মাস ২০ দিনের এক বর্ণাঢ্য, আলোকময় শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন তিনি। জীবনের শেষ কর্মদিবসে তিনি যা পেলেন, তাকে কোনো রাজকীয় রূপকথার চেয়ে কম বলা যায় না।
দিনটি ছিল ২৯ জুন সোমবার। বিকেল হতেই নন্দলালপুর বিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণটায় এক অদ্ভুত মায়াবী, অথচ ভারী বাতাস বইতে শুরু করল। উপলক্ষ—প্রিয় প্রধান শিক্ষকের অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন সহকর্মী, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর এলাকার গণ্যমান্য মানুষ। বিদায়ের ঘণ্টা যখন বাজল, তখন চারপাশের বাতাসে যেন একরাশ বিষণ্ণতা ভর করল। বর্তমান আর প্রাক্তন ছাত্ররা যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাদের প্রিয় ‘স্যার’-এর স্মৃতিচারণ করছিল, তখন কত শক্ত পুরুষের চোখ যে গোপনে ভিজে উঠেছিল, তার কোনো হিসাব নেই।
সুখ রঞ্জন বিশ্বাস ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর সাদুল্ল্যাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এই পবিত্র ব্রত শুরু করেছিলেন। এরপর দুর্গাপুর বিদ্যালয় হয়ে ১৯৯৬ সালে পা রাখেন এই নন্দলালপুরে। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর যখন তিনি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের আসন অলংকৃত করেন, তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। সহকর্মীরা বলছিলেন, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষ, এক পরম অভিভাবক ও পরামর্শদাতা। তাঁর সততা, শৃঙ্খলা আর শিক্ষার প্রতি নিবেদন আগামী প্রজন্মের জন্য এক অবিনাশী আদর্শ হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগত জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ের এই জনক আজ এক সফল পিতা—বড় ছেলে ব্যাংকার, মেয়ে বাবার মতোই শিক্ষক আর ছোট ছেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষারত।
বিদায়বেলায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন মাইক্রোফোনটা হাতে নিলেন সুখ রঞ্জন বিশ্বাস, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর আবেগে কাঁপছিল। তিনি বললেন—
“নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু আমার কর্মস্থল ছিল না, এটি আমার দ্বিতীয় পরিবারে পরিণত হয়েছিল। একজন শিক্ষক অবসরে যেতে পারেন, কিন্তু শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ কখনো অবসর নেয় না। শিক্ষকতা আমার কাছে কেবল একটি চাকরি ছিল না; এটি ছিল একটি মহান ব্রত। আজ বিদায়ের এই ক্ষণে আপনাদের সবার যে অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। আমার কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামানের সঞ্চালনায় শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আরও বক্তব্য রাখেন মতলব উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আনিছুর রহমান, চরপাথালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীকৃষ্ণ পাল, সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন, উপজেলা স্কাউট কমিশনার শাহজাহান, উপজেলা স্কাউট সম্পাদক আক্তার হোসেন, উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিকুজ্জামান এবং সহকারী শিক্ষক পারুল রানী বিশ্বাস, সালেহা আক্তার, বিল্লাল হোসেন, হোসনেয়ারা আক্তার ও ঝুমুর আক্তারসহ অনেকে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষে সুমন খান ও ডা. মোহন মিয়া তাঁদের স্যারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
তবে সবচেয়ে চোখ জুড়ানো এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্যটি অপেক্ষা করছিল অনুষ্ঠানের শেষে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং এলাকাবাসী তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে এনেছিলেন ফুল দিয়ে সুসজ্জিত একটি রাজকীয় প্রাইভেটকার। সেই গাড়িতে যখন সুখ রঞ্জন বিশ্বাস বসলেন, আর গাড়িটি ধীরলয়ে তাঁর নিজ বাড়ির অভিমুখে রওনা হলো, তখন রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর সাধারণ মানুষ হাত নেড়ে ফুল ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন।
বাতাসে তখন ফুলের পাপড়ি উড়ছিল, আর মানুষের চোখ থেকে ঝরে পড়ছিল নোনা জল। গাড়িটি এগিয়ে যাচ্ছিল, আর সুখ রঞ্জন বিশ্বাস হয়তো পেছনে ফেলে আসা চক-ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড আর হাজারো শিশুর কলকাকলির দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসছিলেন।
একজন প্রকৃত শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ-পদবি বা বৈষয়িক পুরস্কার নয়; বরং শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে আজীবন ভালোবাসার এক টুকরো আসন তৈরি করে নেওয়া। সুখ রঞ্জন বিশ্বাস আজ অবসরে গেলেন ঠিকই, কিন্তু নন্দলালপুরের আকাশে-বাতাসে তাঁর রেখে যাওয়া মানবিকতার সুবাস রয়ে যাবে অনন্তকাল।