প্রকাশ্যে প্রথমবারের মতো চলতি বছরেই বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে ২০২৬ সালের মধ্যেই দেশে ফিরবেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। দেশ ছাড়ার প্রায় দুই বছর পর এই প্রথম তিনি নিজের প্রত্যাবর্তনের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দিলেন। তার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রতিটি বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।”
তবে তার দেশে ফেরার পথ সহজ নয়। গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
শেখ হাসিনা ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে এটিকে “অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্ররোচিত” বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ষড়যন্ত্র চলছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জনগণের ভোটে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সাক্ষাৎকারে কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশে চরমপন্থার বিস্তার ঘটছে। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বর্তমানে বেশি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন এবং বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে, বর্তমান সরকার ও সরকারসমর্থক মহল অতীতে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ছাত্র আন্দোলনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে আসছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, যাদের ২০২৫ সালের মে মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে তিনি দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও শক্তিশালী রয়েছে এবং সমর্থকেরা বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বিএনপির সঙ্গে গোপন সমঝোতার কোনো আলোচনা চলছে—এমন খবরও নাকচ করে দেন। তার বক্তব্য, সাংবিধানিক অধিকার বা ন্যায়বিচার কোনো গোপন সমঝোতার মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। তিনি রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার দাবি জানান।
ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গেও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশের বাইরে থাকতে তার কষ্ট হয় এবং তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানালেও ভারত এখন পর্যন্ত তাকে প্রত্যর্পণ করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তার প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।