ন্যানোপার্টিকেল ও ডিএনএ বারকোড: ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন যুগের সূচনা

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক স্বর্ণের ন্যানোপার্টিকেলের ওপর ডিএনএ বারকোড ব্যবহার করে ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তি চিকিৎসার নির্ভুলতা বাড়িয়ে রোগীর জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে।

চিন্তা করুন, একজন ডেলিভারি কর্মীর হাতে একটি বিশেষ চাবি আছে—চাবি না মিললে প্যাকেজ ঠিক জায়গায় পৌঁছাবে না। ক্যান্সার চিকিৎসায় ন্যানোপার্টিকেলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। প্রতিটি ন্যানোপার্টিকেলের আকার, আকৃতি ও পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য কোষের সঙ্গে মিলতে হবে।

NUS-এর গবেষকরা প্রতিটি ন্যানোপার্টিকেলের সঙ্গে একটি অনন্য ডিএনএ সিকোয়েন্স সংযুক্ত করেছেন, যা একটি “বারকোড” হিসেবে কাজ করে। এর ফলে একই সঙ্গে বহু ন্যানোপার্টিকেল ডিজাইন পর্যবেক্ষণ করা যায়, ঠিক যেমন ডাক বিভাগে একসঙ্গে অনেক পার্সেল ট্র্যাক করা যায়। এই বারকোডগুলো শরীরের ভেতরে ন্যানোপার্টিকেলের অবস্থান সহজে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।

গবেষকরা ছয়টি ভিন্ন আকৃতি ও আকারের ন্যানোপার্টিকেল তৈরি করে পরীক্ষা করেছেন। তাদের আবিষ্কার চমকপ্রদ:

– গোলাকার ন্যানোপার্টিকেল: কোষ সংস্কৃতিতে দুর্বল আচরণ করলেও, প্রাক-ক্লিনিক্যাল মডেলে টিউমারে দারুণভাবে লক্ষ্যভেদ করেছে। কারণ, এদের ইমিউন সিস্টেম দ্বারা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
– ত্রিভুজাকার ন্যানোপার্টিকেল:—উভয় পরীক্ষাতেই চমৎকার ফলাফল দিয়েছে। এদের কোষীয় গ্রহণযোগ্যতা বেশি এবং ফটোথার্মাল থেরাপিতে শক্তিশালী।

এই আবিষ্কারটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, পরীক্ষাগার ও শরীরের ভেতরের ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, যা ন্যানোপার্টিকেল ডিজাইনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।

বর্তমানে FDA-এর অনুমোদিত ন্যানোপার্টিকেলের বেশিরভাগই গোলাকার। কিন্তু এই গবেষণা দেখায় যে, অন্যান্য আকৃতি—যেমন ত্রিভুজাকার—আরও কার্যকর হতে পারে। ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে লোহা, সিলিকা সহ অন্যান্য অজৈব ন্যানোপার্টিকেলও স্ক্রিনিং করা সম্ভব।

ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে একটি ন্যানোপার্টিকেল ডিজাইন পরীক্ষা করতে অনেক সময় ও খরচ লাগে। কিন্তু ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতিতে একই সঙ্গে ১৫০টিরও বেশি ন্যানোপার্টিকেল পরীক্ষা করা যায়, যা প্রাণীর ব্যবহার ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

বিভিন্ন অঙ্গ বিভিন্নভাবে ন্যানোপার্টিকেলের প্রতিক্রিয়া দেখায়। সঠিক আকৃতির ন্যানোপার্টিকেল ডিজাইন করে অঙ্গ-নির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদ (organ-specific targeting) সম্ভব, যা চিকিৎসার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা উভয়ই বাড়ায়।

NUS-এর গবেষকরা তাদের ন্যানোপার্টিকেল লাইব্রেরি ৩০টি ডিজাইনে সম্প্রসারিত করছেন। লক্ষ্য, এমন প্রার্থী চিহ্নিত করা যা কোষের উপকোষীয় অঙ্গাণু (subcellular organelles)—যেমন নিউক্লিয়াস বা মাইটোকন্ড্রিয়া—লক্ষ্য করতে পারে। এরপর সেগুলো ব্রেস্ট ক্যান্সারের জিন নির্বাচন ও ফটোথার্মাল থেরাপিতে পরীক্ষা করা হবে।

এছাড়া, এই পদ্ধতি RNA জীববিজ্ঞান ও RNA ডেলিভারি কৌশলের বোঝাপড়ায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে, যা হৃদরোগ, ক্যান্সার ও পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় জিন থেরাপির উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।

ডিএনএ বারকোডযুক্ত ন্যানোপার্টিকেল ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি বিপ্লবী পদক্ষেপ। এটি শুধু চিকিৎসার নির্ভুলতাই বাড়ায় না, বরং রোগীর জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার পথও প্রশস্ত করে। সিঙ্গাপুরের এই গবেষণা বিশ্বজুড়ে ন্যানোমেডিসিনের গবেষকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *