রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের প্রথম সফল ‘এক্সিট’

বাংলাদেশে স্টার্টআপে সরকারি বিনিয়োগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সফল ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এক্সিট’ সম্পন্ন হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আওতাধীন রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান পালসটেক লিমিটেড থেকে সফলভাবে এক্সিট সম্পন্ন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি আর্থিক লেনদেন নয়; বরং বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা ও পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

মঙ্গলবার (৪ঠা আগস্ট) রাজধানীর আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইসিটি বিভাগের সচিব ও স্টার্টআপ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশীদ ভূঁঞার উপস্থিতিতে এক্সিট প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল হাই, পালসটেক লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরেফীন রাফী আহমেদ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আশিকুর রসুলসহ উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

একটি স্টার্টআপে বিনিয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় শেষে বিনিয়োগকারী যখন লাভ বা নির্ধারিত আর্থিক ফলাফল নিয়ে তার শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে আসে, সেটিকে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ভাষায় ‘এক্সিট’ বলা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি একটি স্টার্টআপের সফলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনুষ্ঠানে আইসিটি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁঞা বলেন, উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রথম সফল এক্সিট শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বাংলাদেশের পুরো স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে যে দেশের স্টার্টআপ খাত ধীরে ধীরে আরও পরিপক্ব হচ্ছে।

স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূরুল হাই বলেন, কোনো বিনিয়োগ থেকে এক্সিট করলেও প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। ভবিষ্যতেও স্টার্টআপগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার পাশাপাশি দেশে আরও বেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ চলবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রায় সব খাতেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।

পালসটেক লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরেফীন রাফী আহমেদ বলেন, শুরু থেকেই স্টার্টআপ বাংলাদেশ তাদের প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রেখেছিল এবং সেই সমর্থনই প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার ভাষায়, এই সফল এক্সিট প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশেও বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক আর্থিক ফল দিতে পারে।

স্টার্টআপ বাংলাদেশ জানায়, তারা এই এক্সিটকে শুধু একটি আর্থিক সাফল্য হিসেবে দেখছে না। বরং এটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের স্টার্টআপ বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরবে এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে একটি কার্যকর বিনিয়োগ খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।

বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে স্টার্টআপ বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতের ৩৬টি সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে। শুধু অর্থায়ন নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য কৌশলগত পরামর্শ, সুশাসন নিশ্চিত করা, পরবর্তী ধাপের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে।

২০২৪ সালে স্টার্টআপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পাওয়ার পর পালসটেক লিমিটেড দেশের দ্রুত বর্ধনশীল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি (হেলথটেক) প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা, এমবেডেড ফাইন্যান্সিং, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস (SaaS) এবং ফার্মেসি ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটওয়ার্ককে এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে দেশের ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ পাওয়ার পর তাদের বার্ষিক রাজস্ব প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি হয়েছে। গত ১৮ মাসে কোম্পানিটি প্রতি মাসে গড়ে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। বর্তমানে তারা ১৪ হাজারের বেশি ফার্মেসিকে সেবা দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ঢাকার প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের কাছে ওষুধ সরবরাহের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে।

পালসটেক এখন সিরিজ-এ বিনিয়োগ সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজারেও কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড আইসিটি বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। উদ্ভাবনী ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য। এই প্রথম সফল এক্সিট সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *