পর্যটন হাব হতে ‘ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম’ উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ

বাংলাদেশকে একটি পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নদী, হাওর, খাল-বিলসহ দেশের জলভিত্তিক পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ‘ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম’ উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

বৃহস্পতিবার (১৩ই আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজধানীর পর্যটন ভবনে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আয়োজিত ‘ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম উন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারেনি। বর্তমান সরকার কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করে এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করছে। বাংলাদেশকে পর্যটন হাবে পরিণত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা দূর করতে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যটন নীতি ২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে।

দেশের পর্যটন স্পটগুলোকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন করা হবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পর্যটন খাতের অগ্রযাত্রায় বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলের সভা প্রতি ছয় মাস অন্তর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানানো হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সবার সহযোগিতায় অদূর ভবিষ্যতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সেমিনারে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার, এনডিসি। তিনি বলেন, পর্যটন খাত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে ইতোমধ্যে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট (টিএসএ) তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

ফাহমিদা আখতার বলেন, চলতি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) টাঙ্গুয়ার হাওর উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অতীতে আন্তঃমন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পর্যটন খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পায়নি। সমন্বয় বাড়াতে পারলে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের নদীমাতৃক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের প্রায় পুরো ভূখণ্ডই কোনো না কোনোভাবে ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজমের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। তবে এ পর্যটনকে এগিয়ে নিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, পর্যটন উন্নয়নের সুফল স্থানীয় জনগণ পেলে তারা নিজেরাই পর্যটন সম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সেমিনারে বাংলাদেশের ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজমের গুরুত্ব, বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা ও করণীয় নিয়েও মতামত তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রউফ, এনডিসি।

বাংলাদেশের পর্যটনকে শুধু পাহাড়, সমুদ্র বা ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমিকে পর্যটনের অংশ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাক ওয়াটার ট্যুরিজম দেশের পর্যটন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *