ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফিফার একটি নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ঘিরে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল কর্তৃপক্ষের আপত্তির পর এখন সরাসরি রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ফিফা সভাপতিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছেন, ইনফান্তিনো ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য “সঠিক ব্যক্তি নন”। তার মতে, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার ধারণাই একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফিফার নতুন উদ্যোগ ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিফার বড় বড় প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বাইরের বিনিয়োগকারীরা অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন।
ফিফার পক্ষে বলা হচ্ছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে এবং সদস্য দেশগুলো ভবিষ্যতে আরও বেশি আর্থিক সুবিধা পাবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে বিশ্বকাপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার ওপর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্বের তিনটি বড় ফুটবল অঞ্চল অবস্থান নিয়েছে।
ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগ পণ্য নয় এবং এর কোনো অংশ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেওয়া উচিত নয়। সংস্থাটি বলেছে, “বিশ্বকাপ বিক্রয়ের জন্য নয়।”
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বলেছে, ফিফার এই পরিকল্পনা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি এবং এতে প্রয়োজনীয় ঐকমত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এএফসি আরও অভিযোগ করেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কনফেডারেশন, সদস্য দেশ এবং ফিফার নিজস্ব পরিচালনা কাঠামোর যথেষ্ট অংশগ্রহণ ছিল না।
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
এই তিন অঞ্চলের ভোট সংখ্যা মিলিয়ে ১৩৬টি। ফিফার মোট সদস্য দেশ ২১১টি। কোনো সিদ্ধান্ত পাস করতে প্রয়োজন ১০৬ ভোট। ফলে এই তিন কনফেডারেশন নিজেদের অবস্থানে অটল থাকলে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিকল্পনাটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো পদত্যাগ করেছেন। তিনি এই উদ্যোগকে “ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি” হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন, এতে ফুটবলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তার পদত্যাগ ফিফার ভেতরের মতপার্থক্যের বিষয়টিও সামনে এনেছে।
ফিফা অবশ্য নিজেদের পরিকল্পনার পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে। সংস্থাটি বলেছে, “কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না।” তাদের দাবি, কিছু ভুল সংবাদ প্রতিবেদনের কারণে এই উদ্যোগ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
ফিফার যুক্তি, নতুন বাণিজ্যিক কাঠামোর মাধ্যমে আয় বাড়ানো গেলে বিশ্বের ছোট ও উন্নয়নশীল ফুটবল দেশগুলো আরও বেশি সহায়তা পেতে পারে।
বিশ্ব ফুটবলের অনেক ছোট দেশ ফিফার আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ মনে করে, ফুটবলের উন্নয়নের জন্য আরও অর্থ প্রয়োজন।
উগান্ডা ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা রজার্স ব্যামুকামা বলেছেন, আফ্রিকার মতো অঞ্চলে ফুটবল পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই নতুন অর্থের উৎস তৈরি করার যেকোনো উদ্যোগ বিবেচনা করা উচিত।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত তাদের উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সদস্য দেশগুলোকে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৬ সময়ের জন্য ‘ফিফা ফরওয়ার্ড ৩.০’ কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হয়েছে।
ইনফান্তিনোর জন্য এই সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক বিরোধ নয়; এটি ফিফার ভবিষ্যৎ পরিচালনা পদ্ধতি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তাতে বাণিজ্যিক স্বার্থ কতটা যুক্ত হবে এবং ছোট দেশগুলো কতটা লাভবান হবে—এসব প্রশ্ন এখন সামনে।
ফিফা সভাপতিকে এখন একদিকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখাতে হবে, অন্যদিকে ফুটবলের ঐতিহ্য ও স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ দূর করতে হবে। আগামী সপ্তাহগুলোতে এই বিতর্কই নির্ধারণ করবে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী অবস্থানে আছে।