এক শিক্ষকেই চলছে ৬০০ শিক্ষার্থীর পুরো বিদ্যালয়!

চারদিকে ভারত। মাঝখানে দহগ্রাম। আর সেই দহগ্রামের একমাত্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে একজন মানুষ একাই সামলাচ্ছেন ৬০০টি শিশুর ভবিষ্যৎ। তিনি ক্লাস নেবেন, নাকি অফিস দেখবেন, নাকি হাল ধরবেন ডুবন্ত জাহাজের?

সকাল আটটা। দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

ফরিদুল ইসলাম স্কুলের গেট খুলছেন। আজও তিনিই প্রথম এসেছেন।

কারণ তিনিই এই স্কুলের একমাত্র শিক্ষক।

তার কাজ কী? প্রধান শিক্ষক। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক। অফিস সহকারী। রেজিস্টার দেখা। ক্লাস নেওয়া। পরীক্ষা নেওয়া। অভিভাবকদের সাথে কথা বলা। আর মাঝে মাঝে—যখন সময় পান—নিঃশ্বাস নেওয়া।

বাইরে ৬০০ জন শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছে।

কেউ ক্লাস সিক্সে পড়ে । কেউ ক্লাস টেনে। কেউ গণিত শিখতে চায়, কেউ ইংরেজি।

ফরিদুল ইসলাম একা কতটা পারবেন?

সর্বোচ্চ পাঁচটা ক্লাস।

বাকি ক্লাসগুলো ? তার কী হবে?

দহগ্রাম। নামটা শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সেই বহুল আলোচিত ছিটমহলের গল্প। চারদিকে ভারতের ভূখণ্ড। মাঝখানে বাংলাদেশের এই ছোট্ট জনপদ। বহুল আলোচিত তিনবিঘা করিডোর দিয়ে মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত।

১৯৭৫ সাল। দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে স্থানীয়দের উদ্যোগে গড়ে ওঠে এই বিদ্যালয়। ২০১৩ সালে তৎকালীন সরকার একে জাতীয়করণ করে। কাগজে-কলমে এখন এটা একটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

বাস্তবে?

বাস্তবে এটা একটা ডুবন্ত জাহাজ। আর সেই জাহাজের হাল ধরে আছেন একজন মানুষ।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ২৫ জন শিক্ষকের পদ থাকার কথা।

২৫ জন।

২০১৩ সালে জাতীয়করণের সময় এই স্কুলে সরকারি আওতায় এসেছিলেন মাত্র ৭ জন। তারপর সময় গড়িয়েছে। একজন একজন করে অবসরে গেছেন। প্রথমে দুইজন। তারপর আরও দুইজন। তারপর আরও দুইজন।

আর এখন?

এখন আছেন শুধু ফরিদুল ইসলাম। সহকারী প্রধান শিক্ষক। এবং তিনিই এখন একা এই পুরো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে। একজন শিক্ষক দিয়ে কীভাবে চলে একটা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়?

শাহারিয়ার হোসেন। ক্লাস নাইনের শিক্ষার্থী।

সে বলছিল, “একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির ক্লাস চলে। কিন্তু শিক্ষক মাত্র একজন। তিনি ক্লাস নেবেন, না অফিসিয়াল কাজ সামলাবেন? বাধ্য হয়ে আমরা আন্দোলনে নেমেছি।”

হ্যাঁ, শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছে। আন্দোলন করছে।

ভাবুন একবার। একটা স্কুলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করছে—কারণ তাদের শিক্ষক নেই।

আজিজুল ইসলাম, একজন স্থানীয় অভিভাবক, বললেন, “একজন শিক্ষক দিয়ে পুরো একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কীভাবে চলে? কর্তৃপক্ষের তো কাগজে-কলমে দেখেই বিষয়টি বোঝার কথা। দুর্গম ও অবহেলিত এই জনপদ কি তবে অন্ধকারেই থেকে যাবে?”

ফরিদুল ইসলাম ক্লান্ত। তিনি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষকের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছেন।

কোনো উত্তর আসেনি।

তিনি বললেন, “একা পুরো প্রতিষ্ঠান সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক রোকসানা বেগম জানালেন, “নন-ক্যাডার থেকে শিক্ষক পদায়নের চেষ্টা চলছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।”

দ্রুততম সময়।

এই শব্দটা আমরা আগেও শুনেছি।

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ আমজোড়া নুরুন্নাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একজন শিক্ষক তিন বছর ধরে একা ৫০ জন শিক্ষার্থী সামলাচ্ছেন।

এবং দহগ্রামে?

এখানে একজন শিক্ষক একা ৬০০ জনকে সামলাচ্ছেন। দহগ্রাম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। দুর্গম জনপদ। এই জনপদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা এই বিদ্যালয়টি। আর এই বিদ্যালয়ের একমাত্র ভরসা একজন মানুষ।

যদি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন? যদি তিনি হাল ছেড়ে দেন? যদি তিনি আর না আসেন?

তাহলে ৬০০ জন শিক্ষার্থীর কী হবে?

স্থানীয় সচেতন মহল আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সীমান্তে ঘেরা এই অবহেলিত জনপদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

রাত হয়ে গেছে। ফরিদুল ইসলাম স্কুলের গেট বন্ধ করছেন। আজও তিনিই সবার শেষে যাবেন।

তার পেছনে পড়ে আছে ৬০০টি শিশুর স্বপ্ন। ৬০০টি পরিবারের আশা। আর একটা জনপদের ভবিষ্যৎ।

সরকারি বিধিমালা বলে ২৫ জন শিক্ষক থাকার কথা।

বাস্তবে আছেন ১ জন।

এবং সেই ১ জন মানুষ প্রতিদিন প্রমাণ করছেন—একজন সৈনিকও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কতদিন?

দহগ্রামের ওই স্কুলের গেটে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে। লেখা—”দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়”।

কিন্তু এই সাইনবোর্ডের নিচে যে গল্পটা চলছে, সেটা কোনো সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গল্প নয়।

এটা একটা ডুবন্ত জাহাজের গল্প।

আর সেই জাহাজের হাল ধরে আছেন একজন মানুষ।

একা।

সীমান্তের ওপারে।

অন্ধকারের মাঝে।

 

 

সাব্বির হোসেন
হাতিবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *