জুলাই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বাজেট সংশোধনের দাবি রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অগণতান্ত্রিক এবং বাস্তবতা-বিবর্জিত বলে আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। সংগঠনটি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি অবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন।

শুক্রবার (১৯শে জুন) সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বাজেট প্রতিক্রিয়া ও বিকল্প প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম।

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া লিখিত বক্তব্যে বলেন, একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ এমন একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রত্যাশা করেছিল, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র হারিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাজেট দেশীয় শিল্প ও কৃষির বিকাশ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিবর্তে অর্থপাচার ও বৈষম্যকে উৎসাহিত করতে পারে।

সংগঠনের মতে, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত “কর্মসংস্থানই উন্নয়ন”। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তারা কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরে।

কর কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত প্রগতিশীল কর আরোপ এবং ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সম্পদ কর চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কর ছাড় এবং নতুন স্টার্ট-আপ ও কুটির শিল্পকে সাত বছরের জন্য কর অবকাশ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, নতুন সরকারি গাড়ি ক্রয় এবং বিলাসী খাতে ব্যয় বন্ধ করার প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বাতিল করে “বিদ্যুৎ না হলে অর্থপ্রদান নয়” নীতি চালুর দাবিও জানানো হয়।

দেশীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য সরকারি প্রকল্পে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ দেশীয় পণ্য ও সেবা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিফর্মে শতভাগ দেশীয় কাপড় ব্যবহারের দাবি জানানো হয়।

স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড’ এবং ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা’ চালুর প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়ে মানুষের নিজস্ব খরচ শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

শিক্ষা খাতে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ভাউচার চালুর প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়।

কৃষি খাতে গ্রামভিত্তিক কৃষি সমবায় গঠন, যান্ত্রিকীকরণ, উপজেলাভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়। সার, বীজ ও সেচে সরাসরি নগদ ভর্তুকি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।

সংগঠনটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে সোলার বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দেয়। তাদের লক্ষ্য, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ করা। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক স্টার্ট-আপ উৎপাদন কেন্দ্র এবং শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকে সংযুক্ত করতে বিশেষ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, দেশের সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাজেট কর্মসংস্থানমুখী নয় এবং দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।

তিনি আরও বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদাবনতি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা উচিত।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সোহেল সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় দলের সিনিয়র সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান, সহসভাপতি হাবিবুর রহমান রাজা, নির্বাহী কমিটির সদস্য মঞ্জুর কাদির ও শাহাবুদ্দিন কবিরাজসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেট দ্রুত সংশোধন করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *