বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বি.টি.এস (ব্যাংট্যান সনিয়োনদান) আগামী গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির নতুন ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ চালুর পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। বি.টি.এসের সদস্যদের মতে, সংগীতকে অঞ্চল বা ভাষার ভিত্তিতে আলাদা না করে তার নিজস্ব শিল্পমূল্য দিয়ে বিচার করা উচিত।
২৯শে জুলাই বি.টি.এসের সাত সদস্য—আরএম, জিন, শুগা, জে-হোপ, জিমিন, ভি ও জংকুক—নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই বার্তা প্রকাশ করে গ্র্যামিতে কোনো গান জমা না দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তাদের বক্তব্য ছিল, সংগীতের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান, সংগীতকে তার নিজস্ব মান ও সৃষ্টিশীলতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হোক।
রেকর্ডিং অ্যাকাডেমি ১৬ই জুন নতুন ‘বেস্ট এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগ চালুর ঘোষণা দেয়। এই বিভাগে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের পপ সংগীতকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় কে-পপ, জে-পপ ও সি-পপসহ বিভিন্ন ধারার সংগীত থাকবে।
রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির প্রধান নির্বাহী হারভে মেসন জুনিয়র বলেন, এশিয়ার পপ সংগীতের জনপ্রিয়তা, বৈচিত্র্য ও শিল্পীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই নতুন বিভাগটি চালু করা হয়েছে।
তার মতে, এই বিভাগ চালু হওয়ার অর্থ শিল্পীদের আলাদা করে দেওয়া নয়। কারণ একই শিল্পী চাইলে ‘রেকর্ড অব দ্য ইয়ার’ বা ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’-এর মতো মূল বিভাগেও প্রতিযোগিতা করতে পারবেন।
তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, এ ধরনের আলাদা বিভাগ অনেক সময় মূলধারার পুরস্কারের বাইরে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের শিল্পীদের সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে।
বি.টি.এসের আপত্তির মূল বিষয় হলো—সংগীতের পরিচয়কে ভৌগোলিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা। তাদের মতে, একটি গান বা শিল্পীর মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার সৃজনশীলতা, প্রভাব ও শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে।
বি.টি.এস গত কয়েক বছরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীতদলে পরিণত হয়েছে। দলটি গ্র্যামিতে পাঁচবার মনোনয়ন পেলেও এখনো কোনো পুরস্কার জিততে পারেনি। ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে তারা টানা তিনবার ‘বেস্ট পপ ডুও/গ্রুপ পারফরম্যান্স’ বিভাগে মনোনয়ন পায়।
তাদের ভক্তরা, যারা ‘আর্মি’ নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে গ্র্যামি বি.টি.এসকে মূলধারার সংগীতশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বি.টি.এসের সিদ্ধান্তে দুঃখ প্রকাশ করলেও রেকর্ডিং অ্যাকাডেমি নতুন বিভাগ চালুর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।
হারভে মেসন জুনিয়র বলেন, নতুন বিভাগ আরও বেশি শিল্পীকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি এশিয়ান শিল্পীদের জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি হয়, তাহলে তারা কি ভবিষ্যতে মূল বিভাগে সমান সুযোগ পাবেন?
এর আগে ল্যাটিন সংগীত ও আফ্রোবিটসের মতো ধারার জন্য আলাদা স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
বি.টি.এসের এই অবস্থান শুধু একটি পুরস্কার বয়কটের ঘটনা নয়, বরং বিশ্ব সংগীত শিল্পে এশিয়ান শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে একটি বড় আলোচনা তৈরি করেছে।
গত কয়েক বছরে কে-পপ পশ্চিমা সংগীত বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বি.টি.এসের অ্যালবাম বিশ্বজুড়ে রেকর্ড গড়েছে, কনসার্টের টিকিট বিক্রি হয়েছে দ্রুতগতিতে এবং দলটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মঞ্চেও বড় সাফল্য অর্জন করেছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—যে শিল্পীরা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তাদের কি শুধু একটি অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা উচিত, নাকি বিশ্ব সংগীতের মূল ধারার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত?
বি.টি.এসের গ্র্যামি বয়কট সংগীত পুরস্কারের কাঠামো ও বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করেছে। অন্য এশিয়ান শিল্পীরাও যদি একই ধরনের অবস্থান নেন, তাহলে বড় সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন ‘এশিয়ান পপ’ বিভাগ সফল হলে এটি এশিয়ার শিল্পীদের জন্য আরও বড় স্বীকৃতির পথ খুলে দিতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বি.টি.এস এখন শুধু একটি সংগীত দল নয়; তারা বিশ্ব সংগীত সংস্কৃতিতে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতীক। তাদের এই সিদ্ধান্ত পুরস্কার ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব ও সমতার প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।