ওয়েলিংটনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আরসিইপিতে সদস্যপদ, এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময় ও দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের সদস্যপদে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় পাওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করা।
ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং নিউজিল্যান্ডের পক্ষে ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড বৈঠকে নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার একটি রূপরেখা তুলে ধরে।
বৈঠকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল আরসিইপিতে সদস্যপদ লাভ। বিশ্বের অন্যতম বড় মুক্ত বাণিজ্য কাঠামো আরসিইপিতে বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৫টি দেশ রয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলীর বিস্তারিত জবাব জমা দিয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে দেশের আইন ও নীতিমালা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কার এগিয়ে চলছে। শিল্পের কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রে আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা বৈঠকে তুলে ধরা হয়।
আরসিইপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিউজিল্যান্ডের নীতিগত প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ দেশটির সক্রিয় সমর্থন চেয়েছে।
একই সঙ্গে আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশের সংবেদনশীল শিল্প ও পণ্য খাতকে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ চাওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আসিয়ানের এলডিসি সদস্যদের মতো ১৫ থেকে ২০ বছর মেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ ছিল এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানো। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চেয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে আবেদন করেছে বাংলাদেশ।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নয়নশীল ও উত্তরণপ্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে।
এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তর, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে, এলডিসি উত্তরণ অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই। বরং অতিরিক্ত তিন বছরকে অর্থনীতিকে আরও প্রস্তুত করা এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরির সময় হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ঢাকা।
এ বিষয়ে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনকে সামনে রেখে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের আলোচনার ধারাবাহিকতায় এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ ধরনের চুক্তি হলে দুই দেশের ব্যবসার জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের বাজার বাড়ানোর সুযোগ পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পর তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবার জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার চাইছে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ এফটিএ দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্যকে কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করতে পারে।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতাকে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাংলাদেশ বৈঠকে তিনটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়।
প্রথমত, আরসিইপি, এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, এফটিএ নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সমর্থন আদায়ে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল মনে করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও উচ্চপর্যায়ের নীতি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিউজিল্যান্ডের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ আমন্ত্রণে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, ওয়েলিংটনের বৈঠকটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বাণিজ্যিক আলোচনা নয়; বরং এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিতে প্রবেশ, এশিয়া-প্যাসিফিকের আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোয় যুক্ত হওয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।