রাশিয়ায় থাকা বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড, সিরিয়ায় ঐতিহাসিক রায়

সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একই মামলায় তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুজনের কেউই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না; তারা রাশিয়ায় অবস্থান করছেন।

মঙ্গলবার (১১ই আগস্ট) দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। একই আদালত আসাদের চাচাতো ভাই এবং দারায় সাবেক রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান আতেফ নাজিবকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। নাজিব বর্তমানে সিরিয়ার হেফাজতে রয়েছেন এবং রায় ঘোষণার সময় কারাগারের পোশাক পরে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

সিরিয়ার ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর ক্ষমতাচ্যুত আসাদ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের নেওয়া এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পদক্ষেপগুলোর একটি। আদালতের এই রায়কে দেশটির নতুন কর্তৃপক্ষের ‘পরিবর্তনকালীন ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আদালতের বিচারক ফাখর আল-দীন আল-আরিয়ান বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যার নির্দেশ, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিচারকের ভাষ্য অনুযায়ী, আসাদ ছিলেন এসব অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ‘সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী’। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।

মাহের আল-আসাদকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন সিরিয়ার চতুর্থ সাঁজোয়া ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন এবং আসাদ সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অন্যদিকে আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ২০১১ সালে দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন। ওই সময় কয়েকজন কিশোর দেয়ালে সরকারবিরোধী স্লোগান লেখার পর তাদের আটক ও নির্যাতনের ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। দারায় নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের অন্যতম সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আদালত নাজিবকে হত্যা, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর মতো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে। রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতের কাঠগড়ায় খাঁচার ভেতরে রাখা হয়েছিল।

বাশার আল-আসাদ ২০০০ সালে তার বাবা হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। প্রায় ২৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহীদের সামরিক অভিযানের মুখে তার সরকার পতন হয়।

ক্ষমতা হারানোর পর বাশার ও মাহের আল-আসাদ রাশিয়ায় চলে যান। মস্কো তাদের আশ্রয় দিয়েছে। সিরিয়ার নতুন সরকার এর আগে রাশিয়ার কাছে বাশার আল-আসাদকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে মস্কো এখন পর্যন্ত তাকে হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি।

ফলে মঙ্গলবারের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাস্তবে বাশার বা মাহেরের ক্ষেত্রে এখনই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারা রাশিয়ায় থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করে সিরিয়ায় ফিরিয়ে আনা না গেলে এই রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে না।

সিরিয়া বিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, রায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে সিরিয়ার নতুন রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থায় একটি আনুষ্ঠানিক অপরাধের রেকর্ড তৈরি করল।

২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর সিরিয়া দ্রুত একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সরকারি বাহিনী, বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইসলামিক স্টেটসহ একাধিক পক্ষের সংঘাতে দেশটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশ-বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক নির্যাতন, নির্বিচার আটক, হত্যা এবং রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে নথিভুক্ত হয়ে আসছে।

এর মধ্যে ২০১৩ সালের দামেস্কের উপকণ্ঠে গৌতা এলাকায় সারিন গ্যাস হামলা বিশেষভাবে আলোচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে ওই হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর তথ্য উঠে আসে। আসাদ সরকারের কারাগারে নির্যাতন ও মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে ‘সিজার ফটোগ্রাফ’ নামে পরিচিত প্রায় ৫৫ হাজার ছবিও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। এসব ছবিতে প্রায় ১১ হাজার বন্দির মরদেহের চিত্র ছিল বলে বিভিন্ন তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

মঙ্গলবারের শুনানিতে শুধু বাশার, মাহের ও আতেফ নাজিব নয়—আসাদ সরকারের আরও কয়েকজন সাবেক সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফাহদ আল-ফ্রেইজ এবং ২০১১ সালে দারায় সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লুয়াই আল-আলি। তারাও সিরিয়ার বাইরে অবস্থান করছেন এবং অনুপস্থিতিতে তাদের বিচার হয়েছে।

এর আগে সিরিয়ার বাইরে ইউরোপের আদালতেও আসাদ সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার হয়েছে। ২০২২ সালে জার্মানির একটি আদালত সাবেক সিরীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা আনোয়ার রাসলানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। ২০২৪ সালে ফ্রান্সেও সিরিয়ার তিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি ছিল—পুরোনো সরকারের অপরাধের বিচার কীভাবে হবে।

নতুন সরকার একদিকে সাবেক সরকারের কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনছে, অন্যদিকে দেশটির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও সহিংসতা কমানোর চেষ্টা করছে। তাই এই বিচার শুধু কয়েকজন ব্যক্তির শাস্তির বিষয় নয়; এটি সিরিয়ার রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সিরিয়ার নতুন সরকারের সম্পর্কেও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের রায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবাধিকারভিত্তিক বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সিরিয়ার জন্য কিছু জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বাস্তবতা অবশ্য বাশার ও মাহের আল-আসাদের অবস্থান। তারা সিরিয়ার আদালতের কাঠগড়ায় নেই, রাশিয়ায় রয়েছেন। ফলে আদালতের রায় তাদের বিরুদ্ধে ইতিহাস ও আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরি করলেও, তাদের শাস্তি বাস্তবে কার্যকর হবে কি না—তা অনেকটাই নির্ভর করছে রাশিয়ার অবস্থানের ওপর।

তবু সিরিয়ার জনগণের জন্য মঙ্গলবারের রায় একটি প্রতীকী মুহূর্ত। প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী দেশ শাসন করা একজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নিজ দেশের আদালত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। ক্ষমতার পতনের প্রায় ২০ মাস পর এই রায় দেখিয়ে দিল—আসাদ পরিবারের শাসনের অবসানের সঙ্গে শুধু একটি রাজনৈতিক যুগের শেষ হয়নি, সেই শাসনের দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *