২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশজুড়ে সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত
মিয়ানমারে ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া সংঘাত এখন এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধগুলোর একটি। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস -এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এই সংঘাতে এক লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও সংঘাত পর্যবেক্ষকদের তথ্য বলছে, বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা, গ্রাম পোড়ানো এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এখন দেশটির দৈনন্দিন বাস্তবতা।
অভ্যুত্থানের আগে মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। রাজনৈতিক সংস্কারের পর বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছিল, দারিদ্র্য কমছিল এবং অং সান সু কি-এর দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমক্রেসি ধারাবাহিক নির্বাচনী জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর সেই অগ্রযাত্রা থেমে যায়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.২ শতাংশ, তা ২০১৭ সালে নেমে আসে ২৪.৮ শতাংশে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
২০১৭ সালে দারিদ্র্য ২৪.৮%, ২০২৩ সালে দারিদ্র্য ৪৯.৭%, ২০২১ সালে জিডিপি পরিবর্তন -১৮% । মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে খাদ্যের দাম প্রায় ৩ গুণ। স্থানীয় অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি ৩০ শতাংশের ওপরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। শহর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই খাদ্য নিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী সামরিক জান্তা। তাদের প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে বিমান হামলা।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে:
- মে ২০২৫: সাগাইং অঞ্চলের দেপায়িনে একটি স্কুলে বিমান হামলায় ২২ শিশু ও ২ শিক্ষক নিহত।
- ডিসেম্বর ২০২৫: রাখাইনের ম্রাউক-উ শহরের একটি হাসপাতালে হামলায় কমপক্ষে ৩৩ জন রোগী, পরিচর্যাকারী ও কর্মী নিহত।
- ২০২৫ সালে বিমান হামলা: প্রায় ৪,৮৮১টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
মানবাধিকার তদন্তকারীরা বলছেন, স্কুল, হাসপাতাল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলার ধরণ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও একা নয়। বিভিন্ন দেশ সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বেলারুশ দিচ্ছে রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, রাশিয়া দিচ্ছে সামরিক হেলিকপ্টার, ইরানের কাছ থেকে পাচ্ছে জেট জ্বালানি সরবরাহ আর চীন দিচ্ছে বৃহৎ অর্থনৈতিক সহায়তা
এই সহায়তার ফলে ২০২৫-২৬ সালে সেনাবাহিনী নতুন করে আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করে এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ পুনর্দখল করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান অভ্যুত্থানের পর পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও তা কার্যকর হয়নি। জাতিসংঘের মানবিক তহবিলও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম অর্থ পেয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে মিয়ানমারবিষয়ক কিছু মানবিক সহায়তা কমানো হয়েছে এবং সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
সংঘাতের কারণে লাখো মানুষ দেশ ছেড়েছে। থাইল্যান্ড-এ বসবাসরত মিয়ানমার নাগরিকের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। ভারত, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশেও শরণার্থী ফেরত পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ-এর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের অন্যান্য বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য থাকা শিবিরগুলোতে মানবিক চাপ আরও বেড়েছে। সাহায্য সংস্থাগুলো খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
গাজা, ইউক্রেন ও অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে মিয়ানমারের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেশটির বহু অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। বিমান হামলা, খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সম্মিলিত প্রভাব মিয়ানমারকে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত করেছে।
সিএফআর-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ ও মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং এর প্রভাব পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: Council on Foreign Relations (CFR), ACLED, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মানবিক সংক্রান্ত নথি।