তরিক রহমান
মাজার সংস্কৃতি বোঝার মতো প্রজ্ঞা সবার হয় না। অনেকের কাছে ধর্ম মানেই ভয়—আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও যেন ভয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। তাদের কল্পনায় আল্লাহ আগুনের শাস্তি দেন, সাপের ছোবলের ভয় দেখান, নানান বিভৎস পরিণতির কথা শোনান; আবার জান্নাতের পুরস্কার হিসেবে মদ ও সুন্দরী নারীর লোভ দেখান। কিন্তু মাজারকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার অভিজ্ঞতা ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলে।
মাজার কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি সমাজের দুঃখী, অসহায়, বিপদগ্রস্ত, বিপথগামী, ছিন্নমূল, ভিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষের আশ্রয়স্থল। এখানে মানুষের ধর্ম, বর্ণ বা সামাজিক পরিচয় বিচার করা হয় না। এখানে গান হয়, বাদ্যযন্ত্র বাজে। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, সেসব গান আল্লাহর প্রেম ও ভক্তি জাগিয়ে তোলার গান; আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সুদিন ফেরানোর গান।
মাজারে যে দান আসে, তার বড় অংশ ব্যয় হয় খাবারের জন্য। যারা দান করেন, তারাও সেই খাবারে অংশ নেন। নিয়মিত ডেগভর্তি রান্না হয়, মানুষকে খাওয়ানো হয়। এখানে কেউ হতাশায় কী খেল, গাঁজা না মদ গ্রহণ করল, বা কী কারণে পথভ্রষ্ট হলো—সেই বিচার করার দায়িত্ব কেউ নিজের কাঁধে তুলে নেয় না। প্রকৃত বিচারের মালিক আল্লাহ।
মাজারে কেউ কাউকে অপবাদ দেয় না। এখানে কাউকে লাথি মেরে, ভাঙচুর করে, মারধর করে, গালাগালি দিয়ে বা অপমান করে দূরে ঠেলে দেওয়া হয় না। আতর মাখা ভদ্রলোকের যেমন স্থান আছে, তেমনি যার তিন কুলে কেউ নেই, যে দিশেহারা হয়ে জীবন কাটাচ্ছে—তারও স্থান আছে। ওলি-আউলিয়ার শিক্ষার অন্যতম দায়িত্বই হলো সমাজে যাদের কেউ আশ্রয় দেয় না, তাদের জন্য দরজা খোলা রাখা।
যাদের কাছে সবকিছু অর্থ ও সম্পদের মাপকাঠিতে দেখা অভ্যাস, তারা মাজারে গিয়ে হাজার কোটি টাকার হিসাব খোঁজে, পথহারা মানুষের গাঁজা দেখে, খাদেমকে চোর ভাবে। অথচ সমাজে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ বা শিক্ষার নামে অমানবিক কাজের অভিযোগ উঠেছে। এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি।
কিন্তু মাজারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। মাজার কখনো ধর্মের নামে মানুষের মাথায় আঘাত করেনি। কারণ মাজারকেন্দ্রিক মানুষেরা বিশ্বাস করে—সবই আল্লাহর লীলা। আল্লাহ কাকে কোন অবস্থায় রেখেছেন, কেন রেখেছেন, তা একমাত্র তিনিই ভালো জানেন।
মাজারে যারা আসেন, তারা ভক্তি ও ভালোবাসার ভিত্তিতে মানুষকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন। এখানে যেন বাঘ ও হরিণ একই ঘাটে পানি খায়। কারণ যে মানুষের মধ্যে অন্ধকার আছে, তাকে তাড়িয়ে না দিয়ে ধীরে ধীরে সেই অন্ধকারকে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই এখানে চর্চিত হয়। সেই পথ প্রেমের, ভক্তির এবং গ্রহণযোগ্যতার।
যারা মসজিদের ভেতরেও অপরাধ করতে পারে, তারা হয়তো আল্লাহকে ভয় পায়; তাদের কাছে আল্লাহ ভয়ের প্রতীক। কিন্তু মাজারের আধ্যাত্মিক ধারায় আল্লাহকে প্রেমের মাধ্যমে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা হয়। ফলে তারা ভালো-মন্দ সবার মধ্যেই আল্লাহর সৃষ্টিকে দেখতে শেখে, তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করে।
এই কারণেই, উপরে উল্লেখিত ধর্ষণ বা নানান কুকর্মের মতো অভক্তি ও অমানবিক আচরণ মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে সাধারণত দেখা যায় না। তবে এত কথা বলার পরও সবার মধ্যে এই উপলব্ধি জন্মাবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। অনেক মানুষের অন্তরে লোভের দগদগে ক্ষত রয়েছে, যার ওপর ধর্মের লেবাস চাপিয়ে রাখা হয়েছে।
মিথ্যা ও মোনাফেকিতে পূর্ণ মানুষেরাই ধর্ম নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে। কিন্তু মাজারের মানুষদের ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখা যায় না। এখানে মানুষ যেমন খুশি পোশাক পরতে পারে, যেমন ইচ্ছা জীবনযাপন করতে পারে। পরে যদি আল্লাহর রহমত হয়, তবে সে আবার সুপথে ফিরে আসতে পারে। তাই আশ্রয়প্রার্থী মানুষদের তাড়িয়ে দিলে সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ওলি-আউলিয়ার শিক্ষার ধারায় মাজার এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের তথাকথিত ‘আবর্জনা’কে ধারণ করে এবং যতটুকু সম্ভব সম্পদে রূপান্তর করার চেষ্টা করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম খাদেমরা এই শিক্ষায় বেড়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই ধর্মীয় অহংকার বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা নেই। তারা নিজেদের সেবক বা খাদেম হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
যার মধ্যে আলো আছে, তাকে আলো দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। মহানবী (সা.) আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার সময়ে এসেছিলেন—একটি অপরিচ্ছন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত সমাজে। ওলি-আউলিয়ারাও এই অঞ্চলে সেই শিক্ষার ধারাবাহিকতা বহন করেছেন বলে অনেকে মনে করেন।
আজ কেউ মাজারকে মদ-গাঁজার আখড়া বলে অপবাদ দিলেও, মাজারের দর্শন হলো—মানুষকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া নয়, বরং তাকে ধারণ করা। কারণ মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া ওলি-আউলিয়ার শিক্ষা নয়।
আপনারা নিজেদের মসজিদ-মাদ্রাসা নিয়ে যত পবিত্র থাকতে চান, থাকুন। কিন্তু কখনো কি মাজারের মানুষদের ধর্মের নামে অন্যদের ওপর হামলা করতে, ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়? এমন ঘটনা বিরল।
আবার যদি কেউ যুক্তি দেন যে মাজারগুলোকে ‘পরিষ্কার’ করা দরকার, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—অতীতে শহরের পতিতালয়গুলো বন্ধ করার জন্য যে আন্দোলন হয়েছে, তার ফল কী হয়েছে? আজ শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা, হোটেল, অলিগলি এমনকি অনেকের বাসস্থানের আশপাশেও একই ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে। সমস্যার মূল সমাধান কি কেবল স্থান উচ্ছেদে সম্ভব হয়েছে?
তাই মাজার মানেই কোটি কোটি টাকার ব্যবসা নয়, মাজার মানেই চোর-জোচ্চোর খাদেমদের আখড়া নয়। মাজার এমন একটি সামাজিক পরিসর, যা সমাজের অবহেলিত ও প্রত্যাখ্যাত মানুষকে ধারণ করে এবং যতটুকু সম্ভব তাদের ইতিবাচক রূপান্তরের চেষ্টা করে। তাই তাদের নিজেদের মতো থাকতে দেওয়াও প্রয়োজন।
চারপাশে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী এবং ধর্মপ্রাণ মানুষকে অতিরিক্ত পবিত্রতার প্রদর্শনী করতে দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গেও সুফিবাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আপসের পথে হাঁটছে, তখন ইরান দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসের কারণে বিশ্বের বহু মানুষের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তার ভাষায়, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ইরান আজ যে আত্মবিশ্বাস প্রদর্শন করছে, সেটি সুফি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ভয়ের নয়, প্রেমের। আল্লাহ ভালো দিন দিলে যেমন তাঁর প্রতি ভালোবাসা কমে না, তেমনি কঠিন সময় এলেও সেই ভালোবাসা অটুট থাকে। বাহ্যিকভাবে টুপি-দাড়ি থাকুক বা না থাকুক, —অন্তরের আল্লাহপ্রেমই মানুষের সবচেয়ে বড় আরাধনা।