মাগুরায় নদী-খাল ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা শক্তিশালী করার উদ্যোগ চলছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে যুক্ত হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী।
সম্প্রতি মাগুরায় এসব কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন ঢাকায় সুইডেন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান হানা নোরেল। তিনি সুইডেনের সহায়তায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন কমিউনিটি উদ্যোগ ঘুরে দেখেন।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে বায়োডাইভার্সিটি ফর রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস (বিফোরআরএল) প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস)। সুইডিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির লক্ষ্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো। একই সঙ্গে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
মাগুরার মাশাখালী ও নাটুপাড়ায় ফটকি নদীর প্রায় ৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং জলজ পরিবেশের উন্নয়ন এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
একই এলাকায় কানুডা খালের প্রায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশকে স্থায়ী মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জলাভূমি পুনরুদ্ধারের এসব উদ্যোগ শুধু মাছের আবাসস্থল সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের খাদ্য ও জীবিকার বিষয়টিও যুক্ত। সুইডেনের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বিফোরআরএল প্রকল্পের মাধ্যমে খাল পুনরুদ্ধার, কৃষিতে বৈচিত্র্য এবং জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক ফলাফলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মাগুরার চুকিনগর ইকোপার্কেও চলছে সবুজায়ন কার্যক্রম। প্রকল্পের আওতায় সেখানে ফলদ, কাঠ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ৫৫টির বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। এসব গাছ স্থানীয় সবুজ এলাকার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি পাখি, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটির বৃহত্তর লক্ষ্যও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা। সিএনআরএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিফোরআরএল প্রকল্প বাংলাদেশে তিনটি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকায় কাজ করছে। প্রকল্পের আওতা প্রায় ১ হাজার ৮৯১ বর্গকিলোমিটার।
বিফোরআরএল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। মাগুরায় হাউসহোল্ড ফুড প্রোডাকশন (এইচএফপি) এবং ভিলেজ সেভিংস এন্ড লোন এসোসিয়েশনস (ভিএসএলএ)-এর সঙ্গে যুক্ত নারীরা প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণ পাচ্ছেন।
ভিএসএলএ-এর মাধ্যমে তারা সঞ্চয় ও ঋণের সুযোগও পাচ্ছেন। এতে পরিবারের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আয় তৈরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পে নারী ও যুবকদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সুইডিশ সরকারের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এসব উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় মালিকানা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
মাগুরার আরপাড়া বাজারেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বাজার কমিটির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাজারের বাণিজ্যিক বর্জ্য যাতে ফটকি নদী ও আশপাশের খালে গিয়ে না পড়ে, সেটিই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। নদী ও খালে বর্জ্য জমা হলে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল।
স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা গেলে নদী ও খালের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে পুনরুদ্ধার করা জলাভূমির স্থায়িত্বও বাড়বে।
এসব কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। কমিউনিটি-বেজড অর্গানাইজেশন (সিবিও), মৎস্য অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রশাসন এতে অংশ নিচ্ছে।
এই সমন্বিত পদ্ধতি বিফোরআরএল প্রকল্পের মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পটি শুধু কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করতে চায় না। বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করে সামাজিক ও পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে চায়।
সুইডিশ সরকারের অর্থায়নে সিএনআরএস-এর বাস্তবায়নাধীন বর্তমান বিফোরআরএল কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৪ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। এ কর্মসূচির জন্য ৪১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা বরাদ্দ রয়েছে। জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, টেকসই কৃষি ও মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল জীবিকা তৈরির ওপর এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাগুরার নদী, খাল, জলাভূমি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা—এই চারটি বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে প্রকল্পটি। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই এ উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পরিবেশ রক্ষাকে যদি মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। মাগুরায় বিফোরআরএল প্রকল্পের উদ্যোগগুলো সেই সমন্বিত মডেল তৈরিরই একটি উদাহরণ।