মৌসুমের বিরতিতে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অর্থের বিনিময়ে ‘খ্যাপ’ খেলায় অংশ নেওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কয়েকজন খেলোয়াড়। বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক এই বিতর্কে শুধু খেলোয়াড়দের দায় দেখলে সমস্যার পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন জাতীয় দলের ফুটবলাররা ইনজুরির ঝুঁকি জেনেও জেলা বা স্থানীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে খেলতে যাচ্ছেন? এর পেছনে কি কেবল বাড়তি আয়ের আকাঙ্ক্ষা, নাকি দেশের পেশাদার ফুটবলের কাঠামোগত কিছু দুর্বলতাও কাজ করছে?
বাংলাদেশের ফুটবলে মৌসুমের বিরতিতে স্থানীয় টুর্নামেন্টে অর্থের বিনিময়ে খেলোয়াড়দের অংশ নেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ একটি চোট শুধু সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের ক্লাব ক্যারিয়ারকেই নয়, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ ম্যাচ ও প্রস্তুতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সম্প্রতি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানান। সরকার থেকে ফুটবলাররা প্রতি মাসে এক লাখ টাকা পাচ্ছেন। এরপরও কেন তাদের ‘খ্যাপ’ খেলতে হচ্ছে, সেটি তার কাছেও প্রশ্ন।
তিনি জানান, টাঙ্গাইলসহ আরেকটি জেলায় টুর্নামেন্টে অতিথি হিসেবে গিয়ে জাতীয় দলের ফুটবলারদের স্থানীয় পর্যায়ের খেলায় অংশ নিতে দেখেছেন।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে প্রথমে খেলোয়াড়দের সতর্ক করার পক্ষে আমিনুল হক। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে আলোচনা করবেন। প্রথমে সতর্ক করা হবে, এরপরও কেউ একই কাজ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে বাফুফে ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়ালও জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ‘খ্যাপ’ খেলা নিয়ে কথা বলেন। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এখানেই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা মৌসুমের বিরতিতে কোথায়, কী ধরনের প্রতিযোগিতায় এবং কোন শর্তে খেলতে পারবেন—এ বিষয়ে বাফুফের সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা কতটা আছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কোনো জাতীয় দলের খেলোয়াড়কে স্থানীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে খেলতে নিষেধ করা হলে তার আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী হবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। শুধু মৌখিক নির্দেশ, সতর্কবার্তা কিংবা শাস্তির হুমকি দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি সংস্কৃতি বদলানো কঠিন।
একটি লিখিত নীতিমালা থাকলে বিষয়টি অনেক বেশি পরিষ্কার হতে পারে। সেখানে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অফ-সিজনে অংশগ্রহণের অনুমতি, নিষিদ্ধ প্রতিযোগিতার ধরন, ইনজুরির ঝুঁকি, মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প বা আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে দেওয়া সম্ভব।
সমস্যার আরেকটি দিক দেশের ক্লাব ফুটবলের চুক্তি কাঠামো।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্লাব খেলোয়াড়দের সঙ্গে সাধারণত এক মৌসুমের জন্য চুক্তি করে। মৌসুম শেষ হলে সেই চুক্তির বাধ্যবাধকতাও শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী মৌসুমে নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খেলোয়াড়দের ওপর ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ কার্যত থাকে না।
এই সময়টিই অনেক খেলোয়াড়ের জন্য স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ তৈরি করে।
ক্লাবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলে খেলোয়াড়ের ফিটনেস, ইনজুরি ব্যবস্থাপনা এবং অফ-সিজনের কার্যক্রম নিয়েও ক্লাবের পরিকল্পনা ও দায়িত্ব থাকত। একই সঙ্গে খেলোয়াড়ও জানতেন, অনিয়ন্ত্রিত কোনো ম্যাচে চোট পেলে তার পেশাদার ক্যারিয়ার এবং চুক্তি—দুটিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক, চুক্তির শর্ত, ক্লাবের আর্থিক সক্ষমতা এবং খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার নিরাপত্তার বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।
‘খ্যাপ’ খেলার পেছনে বাড়তি আয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ের এসব টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের পরিচিত খেলোয়াড়দের চাহিদা থাকে। ফলে মৌসুমের বিরতিতে তারা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের সুযোগ পান।
সরকারি মাসিক ভাতা থাকলেও একজন পেশাদার ফুটবলারের আয়কে শুধু ওই ভাতার ভিত্তিতে বিচার করা যথেষ্ট নয়। খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার তুলনামূলকভাবে ছোট, পেশাগত নিরাপত্তাও সীমিত। তাই তারা কেন স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে আগ্রহী হচ্ছেন, সেটি বুঝতে তাদের সামগ্রিক আয়, চুক্তির মেয়াদ এবং ক্যারিয়ার নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে তাদের দায়িত্বও আলাদা। একটি স্থানীয় ম্যাচে পাওয়া সামান্য আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বড় ধরনের ইনজুরি হলে তার ক্ষতি শুধু খেলোয়াড়ের নয়; জাতীয় দলও একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারাতে পারে।
এখন পর্যন্ত আলোচনায় মূলত সতর্কবার্তা ও শাস্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু সমস্যাটি যদি দীর্ঘদিনের সংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়কে শাস্তি দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভবত হবে না।
প্রথম প্রয়োজন একটি পরিষ্কার নীতিমালা। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা অফ-সিজনে কোন ধরনের প্রতিযোগিতায় খেলতে পারবেন, কোথায় পারবেন না এবং কোন পরিস্থিতিতে বাফুফের অনুমতি প্রয়োজন—এসব লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ক্লাব ও খেলোয়াড়ের চুক্তি ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। সম্ভব হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অফ-সিজনে খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও ইনজুরি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও কাঠামোবদ্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, খেলোয়াড়দেরও বোঝাতে হবে যে জাতীয় দলের জার্সি শুধু মাঠে নামার দায়িত্ব নয়; নিজের শরীর ও ফিটনেসের যত্ন নেওয়াও পেশাদার দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশের ফুটবলে ‘খ্যাপ’ সংস্কৃতি তাই কেবল কয়েকজন জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেলোয়াড়দের আয়, ক্লাব চুক্তির মেয়াদ, অফ-সিজন ব্যবস্থাপনা এবং বাফুফের নীতিমালার প্রশ্ন।
জাতীয় দলের ফুটবলারদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হলে তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়—প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে খেলোয়াড়ের আর্থিক নিরাপত্তা, ক্যারিয়ার স্বার্থ এবং জাতীয় দলের প্রয়োজন—তিনটিকেই একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।