২০১১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী এক দশকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশনার জগতে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি কাজাখস্তানের আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান। তার প্রতিষ্ঠিত ওয়েবসাইট ‘সাই-হাব’ (Sci-Hub) বিশ্বের লাখো গবেষক ও শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত একটি নাম।
এবার সেই এলবাকিয়ান নতুন করে আলোচনায় এসেছেন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) টুল চালুর মাধ্যমে। ‘সাই-বট’ (Sci-Bot) নামে পরিচিত এই টুলটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের বিশাল সংগ্রহ ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দাবি করছে।
এলবাকিয়ানের দাবি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বিভিন্ন গবেষণা জার্নালের উচ্চমূল্যের সাবস্ক্রিপশনের কারণে প্রয়োজনীয় গবেষণাপত্র সংগ্রহ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি ২০১১ সালে সাই-হাব তৈরি করেন।
সাই-হাবের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন পেইড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র বিনামূল্যে পড়তে পারেন। সমর্থকদের মতে, এটি জ্ঞান ও গবেষণার প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে। তবে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এটি কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে।
সম্প্রতি চালু হওয়া সাই-বট নিয়ে প্রযুক্তি ও গবেষণা মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এলবাকিয়ানের দাবি, এই টুল ব্যবহারকারীদের বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর দিতে বিপুলসংখ্যক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে তথ্য ও সূত্রসহ উত্তর প্রদান করতে সক্ষম।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাই-বটের পেছনে ব্যবহৃত ডাটাবেজে প্রায় ৮ কোটি ৮৮ লাখ গবেষণাপত্র রয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীরা সরাসরি গবেষণাভিত্তিক উত্তর পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
সাই-হাবের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বের বড় বড় একাডেমিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এলবাকিয়ানের বিরোধ চলছে। বিভিন্ন দেশে সাইটটি ব্লক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
তবে এসব বাধা সত্ত্বেও সাই-হাব বিভিন্ন ডোমেইনের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে গবেষক, শিক্ষার্থী ও জ্ঞানপ্রত্যাশী মানুষের একটি বড় অংশ এখনও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে থাকে।
সাই-হাবকে ঘিরে মতভেদ স্পষ্ট। অনেক গবেষক ও শিক্ষার্থী মনে করেন, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। তাদের কাছে এলবাকিয়ান জ্ঞানপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার একজন প্রতীক।
অন্যদিকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গবেষণা প্রকাশ, সম্পাদনা ও সংরক্ষণের জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাদের মতে, কপিরাইট সুরক্ষা ছাড়া গবেষণা প্রকাশনার বর্তমান কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এই সময়ে সাই-বট নতুন একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কি উন্মুক্তভাবে সবার কাছে পৌঁছাবে, নাকি তা কপিরাইট ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি ও উন্মুক্ত গবেষণা প্রবেশাধিকারের সমন্বয় ভবিষ্যতে বিজ্ঞান প্রকাশনা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও উঠে এসেছেন আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান, যিনি একসময় একা হাতে সাই-হাব তৈরি করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।