ইরান এখনো ছয় বছরের লাগাতার খরার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির পানি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যদিও চলতি বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে, তবুও দেশের ১২টি প্রদেশে বৃষ্টিপাত এখনো স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে—যেখানে প্রায় ৪০ মিলিয়ন মানুষ বাস করে।
ইরানের জাতীয় জলবায়ু ও খরা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের প্রধান আহাদ ভাজিফের তথ্যানুযায়ী, চলতি জলবর্ষের শুরু থেকে (সেপ্টেম্বর ২০২৫) দেশে মাত্র ২.২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী গড় ছিল ৯.৮ মিলিমিটার। অর্থাৎ, বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।
তেহরানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কমেছে ৭৬.৯ শতাংশ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রদেশে এখন পর্যন্ত এক ফোঁটা বৃষ্টিপাতও হয়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে, এটি গত ৫৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক শরৎকাল।
দেশের ১৯৩টি জলাধারের মাত্র ৩৩ শতাংশ জলপূর্ণ। অর্থাৎ, দুই-তৃতীয়াংশ ফাঁকা। তেহরানের পাঁচটি প্রধান বাঁধের মধ্যে লার বাঁধ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। আমির কাবির বাঁধে জলের পরিমাণ মাত্র ৮ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে তেহরান, মাশহাদ, আরাক ও তাবরিজের মতো বড় শহরগুলো “জল সংকট” অবস্থায় রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এমনকি সতর্ক করে দিয়েছেন, যদি বৃষ্টিপাত না বাড়ে, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে তেহরান থেকে সরিয়ে নিতে হতে পারে।
খরার প্রভাব শুধু পানীয় জলে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ৯০ শতাংশ জল ব্যবহৃত হয় কৃষিতে—প্রধানত গম ও চালের মতো জলসেচনির্ভর ফসল চাষে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন, যার মধ্যে জল সংকট একটি বড় ভূমিকা রাখছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ধাক্কা লেগেছে। জলাধার ফাঁকা হওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে বাধ্য হয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। গত গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে যাওয়ায় সরকারি দফতর বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
ইরানের পানি ব্যবস্থাপনা কোম্পানির উপ-পরিচালক মেহদি দানেশগর জানিয়েছেন, চলতি বছর গড় বৃষ্টিপাত ২২৯ মিলিমিটারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এটি একটি “জ্ঞানগত ভুল” হবে যদি কেউ মনে করেন সংকট কেটে গেছে।
সমস্যা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় ও স্থানিক বণ্টন অসম। কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলেও, ১২টি প্রদেশে তা স্বাভাবিকের নিচে। যেমন—জাঞ্জান প্রদেশে বৃষ্টিপাত ১০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু তাহম বাঁধের জলস্তর ৪১ শতাংশ কমে গেছে, আর কিনেভেরস বাঁধে ৫৭ শতাংশ কমে গেছে।
খরা মোকাবিলায় ইরানে “মেঘ বপন” প্রকল্পের কথা উঠেছে। কিন্তু আহাদ ভাজিফে স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই পদ্ধতি বৈশ্বিকভাবে নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ধুলোর কণা প্রচুর থাকলেও আর্দ্রতার অভাব মেঘ গঠনে বাধা দেয়।
তবে তিনি মনে করেন, এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালানো যেতে পারে, কিন্তু বড় আকারে বিনিয়োগের আগে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা জরুরি।
বিশ্ব আবহাওয়া বৈশিষ্ট্যনির্ণয় ( ওয়ার্ল্ড ওয়েদার এট্র্রিবিউশন) সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় ইরানের মতো খরা এখন প্রতি ১০ বছরে একবার ঘটবে, যা আগে ৫০-১০০ বছরে একবার ঘটত।
আহাদ ভাজিফের মতে, ইরানের জলবায়ু কাঠামোগতভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—”শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে, আর ভেজা মৌসুম সংকুচিত হচ্ছে”।
ইরানের জল সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতাও এর সাথে জড়িত। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেইনি পানিকে “সবার জন্য বিনামূল্যে” ঘোষণা করেছিলেন, যার ফলে কৃষিতে অপচয় বেড়ে গেছে। দশকের পর দশক ধরে শুষ্ক ভূমিতে চাল ও গম চাষ এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন দেশকে “জল দেউলিয়া”-তে পরিণত করেছে।
বর্তমানে কর্তৃপক্ষ জনগণের কাছে ২০ শতাংশ জল সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে। তেহরানের বাসিন্দারা গত সাত মাসে জল ব্যবহার ১২ শতাংশ কমিয়েছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।
মৌসুম বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শীতকালে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে, কিন্তু পূর্বাঞ্চলে ৫০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলেও, বছরের প্রথমার্ধের ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে।
মেহদি দানেশগর বলেছেন, “পেসিমিন্টিক সিনারিও ” বা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। তিনি জোর দিয়েছেন, জল ব্যবস্থাপনায় “অন্তর্বিভাগীয় ও অন্তর্রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি” প্রয়োজন।
ছয় বছরের লাগাতার খরা ইরানকে একটি ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে নিয়ে এসেছে। এটি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং একটি মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। জলের জন্য শহর ছাড়তে হতে পারে—এমন হুমকি আগে কোনো ইরানি নেতাকে দিতে হয়নি। বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে জাতীয় মেটরোলজিক্যাল সংস্থা—সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, পরিস্থিতি “অপ্রত্যাশিত ও ব্যাপক”।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে, ইরানের খরা একটি সতর্কবার্তা—শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, সমগ্র শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক অঞ্চলের জন্য। যখন বৃষ্টিপাত “স্বাভাবিক” হয়ে ওঠে বিলাসিতা, তখন টিকে থাকার লড়াই শুরু হয়।
তথ্যসূত্র: তসনিম নিউজ এজেন্সি, মেহর নিউজ, এপি, বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন, তেহরান টাইমস।