মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আবারও তীব্র হওয়ার পর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাজার কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। জ্বালানির দাম, সরবরাহ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় জরুরি বৈঠকে বসেছেন আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
তিন দিনব্যাপী এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার শীর্ষ কূটনীতিকরাও। বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কীভাবে এশিয়ার অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে।
আসিয়ানভুক্ত ১১টি দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬৮ কোটি। এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে আসিয়ানের মোট কাঁচা তেল আমদানির ৫৬ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। যদিও পরে তা কমে ৭০ ডলারের কিছু ওপরে স্থিতিশীল হয়েছে, তবুও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বৈঠকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারো বলেন, বর্তমান বিশ্বের সংকট কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতাই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি।
পরবর্তীতে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান এবং হরমুজ প্রণালী দ্রুত ও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়ার দাবি জানান।
তাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা নিয়ে তারা “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেন, এই সংঘাত জ্বালানি, খাদ্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা আসিয়ানের প্রায় সব দেশেই দেখা যাচ্ছে।
ফিলিপাইন জ্বালানি আমদানির ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সরকার জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় রুপিয়ার মূল্য ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার অতিরিক্ত ৫.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকির পরিকল্পনা করছে।
থাইল্যান্ড আশঙ্কা করছে, জ্বালানি সংকটের প্রভাবে পর্যটন খাতে প্রায় ৩০ লাখ পর্যটক কম আসতে পারে। সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ধরা হচ্ছে ১৫০ বিলিয়ন বাত বা প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার।
সিঙ্গাপুর, যা এ অঞ্চলের অন্যতম বড় জ্বালানি পরিশোধন ও লজিস্টিকস কেন্দ্র, সেখানে জাহাজ পরিবহনের বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এদিকে মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।
আসিয়ানের মতে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষিপণ্য উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্য ও জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভর, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ম্যানিলার বৈঠকে সদস্য দেশগুলো কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— আসিয়ান পেট্রোলিয়াম সিকিউরিটি অ্যাগ্রিমেন্ট দ্রুত কার্যকর করা। আঞ্চলিক তেল মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জরুরি পরিস্থিতিতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি ভাগাভাগির ব্যবস্থা তৈরি। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড সম্প্রসারণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ। বায়োডিজেল ও বায়োইথানলের ব্যবহার বাড়ানো। বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং ট্রান্স-আসিয়ান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া।
এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ অংশ নিচ্ছেন রুবিও ও ওয়াং ই বুধবার (২২শে জুলাই) পার্শ্ব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। এটি মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেইজিং সফরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মার্কিন-চীন বৈঠক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভর্তুকি বা সাময়িক মূল্য নিয়ন্ত্রণ দিয়ে এই সংকট দীর্ঘদিন সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করা, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত জ্বালানি নীতি গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
ম্যানিলার বৈঠক তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সম্মেলন নয়; এটি আসিয়ানের জন্য ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও।