ঘন টিস্যু কীভাবে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, জানালেন বিজ্ঞানীরা

স্তনের ঘন টিস্যু ও স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য সম্পর্কের ধারণাচিত্র

স্তনের ঘন ও শক্ত টিস্যু কেন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান ফ্রান্সিসকো শাখার গবেষকেরা। তাঁদের গবেষণা বলছে, শক্ত টিস্যু রোগপ্রতিরোধী কোষকে এমনভাবে সক্রিয় করতে পারে, যার ফলে আশপাশের কোষের বংশগত উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ক্যান্সার সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

গবেষণাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ক্যান্সার সেল-এ ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন মেরি-কেট হেওয়ার্ড। গবেষণায় স্তনের টিস্যুর শক্ততা, রোগপ্রতিরোধী কোষ, চর্বির জারণ এবং বংশগত উপাদানের ক্ষতির মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক চিহ্নিত করা হয়েছে।

ম্যামোগ্রামে ঘন স্তন টিস্যু সাধারণত সাদা অংশ হিসেবে দেখা যায়। এতে ক্যান্সারের ছোট অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে। তবে নতুন গবেষণাটি শুধু শনাক্তকরণের সমস্যার দিকে তাকায়নি। গবেষকেরা জানতে চেয়েছেন, এই ধরনের টিস্যু কেন ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষকেরা প্রথমে স্তন ক্যান্সারের উন্মুক্ত বংশগত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। যেসব রোগীর পরিণতি তুলনামূলক খারাপ ছিল, তাঁদের টিউমারে টিস্যুর দাগ বা আঁশযুক্ত পরিবর্তন, রোগপ্রতিরোধী ম্যাক্রোফেজ কোষ এবং বংশগত উপাদানের পরিবর্তন বেশি পাওয়া যায়। পরে রোগীদের টিউমারের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয়, শক্ত অংশে কোলাজেনের পরিমাণও বেশি।

কোলাজেন এমন একটি প্রোটিন, যা টিস্যুকে শক্ত করে তুলতে পারে। গবেষকেরা দেখতে পান, টিউমারের বেশি শক্ত অংশে দাগ, ম্যাক্রোফেজ এবং বংশগত উপাদানের ক্ষতির পাশাপাশি ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংকেতব্যবস্থাও বেশি সক্রিয়।

গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গেছে ম্যাক্রোফেজ নামের রোগপ্রতিরোধী কোষের। স্বাভাবিক অবস্থায় এসব কোষ জীবাণু, মৃত কোষ ও শরীরের ক্ষতিকর উপাদান পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।

গবেষকেরা দেখতে পান, শক্ত টিস্যুতে স্তনের কোষের একটি সংকেতব্যবস্থা সক্রিয় হয়। এর ফলে ম্যাক্রোফেজ ওই এলাকায় আকৃষ্ট হয়। শক্ত পরিবেশে থাকা ম্যাক্রোফেজগুলো তখন অতিসক্রিয় অক্সিজেনজাত পদার্থ তৈরি করতে শুরু করে।

এর পর ঘটে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। ওই অক্সিজেনজাত পদার্থ ম্যাক্রোফেজের ভেতরের চর্বিতে জারণ ঘটায়। এর ফলে অ্যালডিহাইড নামের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। এই পদার্থ ম্যাক্রোফেজের বাইরে বেরিয়ে আশপাশের কোষে পৌঁছাতে পারে এবং সেসব কোষের বংশগত উপাদানের ক্ষতি করতে পারে।

অর্থাৎ, গবেষকদের চিহ্নিত প্রক্রিয়াটি মোটামুটি এমন—টিস্যু শক্ত হওয়া → ম্যাক্রোফেজ আকৃষ্ট হওয়া → অক্সিজেনজাত পদার্থ তৈরি → চর্বিতে জারণ → অ্যালডিহাইড তৈরি → আশপাশের কোষের বংশগত উপাদানের ক্ষতি।

গবেষকেরা শুধু পরীক্ষাগারের কোষ নিয়ে কাজ করেননি। তাঁরা রোগীদের টিউমারের নমুনা এবং স্তন ক্যান্সারের প্রাণী-নমুনাও পরীক্ষা করেছেন। এসব পরীক্ষাতেও শক্ত ও আঁশযুক্ত টিস্যুতে ম্যাক্রোফেজ, অ্যালডিহাইড এবং বংশগত উপাদানের ক্ষতির মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণার ফলাফল থেকে অবশ্য এমন দাবি করা যাচ্ছে না যে ঘন স্তন টিস্যু থাকলেই একজন নারীর ক্যান্সার হবে। বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, ঘন ও শক্ত টিস্যু কীভাবে ক্যান্সার সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়াটি থামানো যায় কি না। তাঁদের ধারণা, ম্যাক্রোফেজের ভেতরে ক্ষতিকর অ্যালডিহাইড তৈরি বন্ধ করতে পারলে বংশগত উপাদানের ক্ষতিও কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এটি এখনো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চিকিৎসার ক্ষেত্র। গবেষণাটি নতুন কোনো প্রতিরোধমূলক ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণ করেনি। বরং ক্যান্সার সৃষ্টির একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া এবং সেটিকে লক্ষ্য করে ভবিষ্যতে চিকিৎসা তৈরির একটি পথ দেখিয়েছে।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক ভ্যালেরি এম. উইভার মনে করেন, এত দিন স্তনের ঘনত্বকে মূলত ক্যান্সার শনাক্তকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ক্যান্সার তৈরির আগের জৈবিক পরিবর্তনগুলো বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে।

ফলে স্তন ক্যান্সার নিয়ে গবেষণায় শুধু টিউমার তৈরি হওয়ার পর সেটি শনাক্ত বা চিকিৎসা করার পাশাপাশি, কোন ধরনের টিস্যুতে ক্যান্সার তৈরির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে এবং সেই প্রক্রিয়া কীভাবে থামানো যায়—সেদিকেও গবেষণার গুরুত্ব বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *