দেশের চা শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও লাভজনক করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, চা খাতকে শুধু ঋণ ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে রাজস্ব, কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে নিয়মিত অবদান রাখে—এমন একটি শক্তিশালী শিল্পে পরিণত করতে হবে।
রোববার (২০শে সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশের চা শিল্পের উন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রথম সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের চা শিল্পের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জীবন-জীবিকা সরাসরি যুক্ত। কোনো চা-বাগান বন্ধ হয়ে গেলে বা আর্থিক সংকটে পড়লে শুধু মালিকপক্ষ নয়, শ্রমিক পরিবার ও সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শ্রমিকদের সুরক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে চা শিল্পকে টেকসই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একসময় চা রফতানি করত। তবে উৎপাদন ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে আবারও দেশের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতে পারে বলে সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান সংকট কাটিয়ে চা শিল্পকে আবার শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়া সম্ভব।
চা-বাগানের মূল বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদনব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে অব্যবহৃত ও অনাবাদি জমি থেকে অতিরিক্ত আয় করার প্রস্তাবও এসেছে সভায়।
এর মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদে অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, কৃষি ও বিকল্প বনায়ন এবং ক্লাস্টার বা নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন হবে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
সভায় চা শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চা প্রবেশ এবং নিলামের বাইরে সরাসরি চা বিক্রির বিষয়টি উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, অবৈধ পথে আসা চা তুলনামূলক কম দামে বাজারে বিক্রি হওয়ায় বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।
সভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিলামে প্রতি কেজি চায়ের দাম যেখানে প্রায় ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা, সেখানে চোরাই চা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবধান বৈধ ব্যবসার জন্য চাপ তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত ও বাজারে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর কাঠামো যৌক্তিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চা-বাগানগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি প্রণোদনা, আবর্তন তহবিল বা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করার বিষয়ে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাগানগুলোর নিজস্ব আয় ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। প্রতিটি বাগানের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকিং ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়।
সভায় ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, কৃষি সচিব মো. সেলিম খান, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবীর আহামদ, বাংলাদেশীয় চা সংসদের চেয়ারম্যান কামরান টি রহমান এবং টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ মাঈনুদ্দিন হাসানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।