চীন-বাংলাদেশ সমুদ্র অর্থনীতি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে সেমিনার

সমুদ্র অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, আধুনিক জলজ চাষ, সামুদ্রিক গবেষণা এবং তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এ সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। চীনের সমুদ্র অর্থনীতির অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়াসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। ‘চীনের সমুদ্র অর্থনীতি: রূপান্তর, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন অধ্যয়ন কেন্দ্র। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৫০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন।

সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন চীনের শাংহাই সমুদ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং চীনের মৎস্য উন্নয়ন কৌশল গবেষণা কেন্দ্রের উপপরিচালক ইয়াং ওয়েই।

তিনি বলেন, চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জলজ খাদ্য আমদানিকারক দেশ। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণির খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবে ২০২৫ সালে বিশ্ববাজার থেকে চীনের সামুদ্রিক খাদ্য আমদানির পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।

চীন মূলত রাশিয়া, ইকুয়েডর, ভিয়েতনাম, নরওয়ে ও ভারত থেকে সামুদ্রিক খাদ্য আমদানি করে। এই বাজার বাংলাদেশের জন্যও সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে মনে করেন ইয়াং ওয়েই।

বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির বড় সুযোগ রয়েছে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির উন্নয়ন করা গেলে এই সুযোগ আরও বাড়বে।

তার মতে, ইলিশ, চিংড়ি ও কাঁকড়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সামুদ্রিক ও জলজ পণ্যের জন্য চীনে বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। তবে এর জন্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

সেমিনারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সমুদ্র অর্থনীতি সহযোগিতার বিষয়টিও উঠে আসে। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে বক্তারা জানান।

বাংলাদেশ ও চীনের সামুদ্রিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গবেষণা ও তথ্য বিনিময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামুদ্রিক গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা, উপগ্রহভিত্তিক পর্যবেক্ষণ তথ্য বিনিময় এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইয়াং ওয়েই জানান, যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা এবং উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সামুদ্রিক পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও সমুদ্রের পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব তথ্য নীতি নির্ধারণ এবং সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহযোগিতা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ধরনের সহযোগিতার অভিজ্ঞতা এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রের কার্বন ধারণক্ষমতা নিয়ে গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উন্নয়নে এ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা শুধু মৎস্য আহরণে সীমাবদ্ধ নয়। সামুদ্রিক গবেষণা, জলজ চাষ, সামুদ্রিক জীবসম্পদ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণেও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন হলে সমুদ্রসম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

প্রায় এক ঘণ্টার সেমিনার শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চীনের সমুদ্র অর্থনীতির অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার এবং দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

সেমিনার শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রধান বক্তা ইয়াং ওয়েইকে সম্মাননা ও স্মারক উপহার দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *