জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা চায় বাংলাদেশ

জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষসমূহের সপ্তদশ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজে অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, সংরক্ষণ কার্যক্রমে অর্থের জোগান বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে ।

আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষসমূহের সপ্তদশ সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এ আহ্বান জানানো হয়। মঙ্গলবার (২৭শে অক্টোবর ) সন্ধ্যায় আরাগাৎস অধিবেশনকক্ষে বাংলাদেশের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিনিধি দলের প্রধান ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম দেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলাশয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির প্রাণ ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং সম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এসব প্রজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, ম্যানগ্রোভ বন ও জলাভূমির অবক্ষয় পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনেও।

ড. ফাহমিদা খানম জানান, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কুনমিং-মন্ট্রিয়ল বৈশ্বিক কাঠামো বাস্তবায়নে সরকার ও সমাজের সব স্তরের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশটি ২৩টি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এসব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে রয়েছে ১০৭টি কার্যক্রম।

পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জীববৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংরক্ষিত এলাকার পরিধি বাড়ানো এবং কার্যকর সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণে কাজ করছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক পদ্ধতিতে ২০৩১ সালের মধ্যে ২৫ কোটি নতুন গাছ লাগানো ও পরিচর্যার উদ্যোগকে সরকারের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জলবায়ু এবং মানুষের কল্যাণেও ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, ভূমির অবক্ষয় রোধ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমের বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়। ২০২৩ সাল থেকে নাগোয়া প্রটোকল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সরকারি সমন্বয়ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ড. ফাহমিদা খানম।

তিনি বলেন, জিনগত সম্পদসংক্রান্ত ডিজিটাল বিন্যাসতথ্য এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি জৈব ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণেও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তবে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিপর্যায়ে দক্ষতার ঘাটতি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য সনদের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে উন্নত দেশগুলোর প্রতি অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ। বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ ও উৎপাদন, পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা চালু, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলধারায় জীববৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে সহায়তা চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের মতে, এ সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে হবে। একই সঙ্গে অর্থায়ন ও সহায়তা ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে আঞ্চলিক উদ্যোগ ত্বরান্বিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূমির অবক্ষয় রোধ ও জলবায়ু কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তির আওতায় তথ্য পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরির ব্যবস্থায় সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেয় বাংলাদেশ।

ড. ফাহমিদা খানম বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ইয়েরেভান সম্মেলন ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার কার্যকর মাইলফলক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

 

আরো পড়ুন : পরিবেশ রক্ষায় সবুজ অর্থায়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *