অ্যানথ্রপিকের নতুন জীববিজ্ঞান গবেষণাগার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ওষুধ গবেষণার নতুন অধ্যায়

সান ফ্রান্সিসকো এলাকায় অ্যানথ্রপিকের জীববিজ্ঞান গবেষণাগারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক যন্ত্রের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ধারণাচিত্র

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এত দিন মূল প্রতিযোগিতা ছিল কম্পিউটার ও সফটওয়্যার ঘিরে। এবার সেই সীমানা পেরিয়ে বাস্তব জীববিজ্ঞান গবেষণায় প্রবেশ করছে মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় এলাকায় একটি নিজস্ব জীববিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন করেছে। সেখানে কম্পিউটারভিত্তিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি সরাসরি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা চালানো হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। অ্যানথ্রপিকের জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান এরিক কাউডারার-আব্রামসও গবেষণাগারটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জীববিজ্ঞানের গবেষণায় বাস্তব পরীক্ষাগারের প্রয়োজন এখনো রয়েছে। অ্যানথ্রপিক নিজস্ব স্থাপনায় কিছু কাজ করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরের অংশীদারদের সঙ্গেও কাজ করবে।

অ্যানথ্রপিকের লক্ষ্য শুধু গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা নয়। প্রতিষ্ঠানটি এমন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের যন্ত্রপাতির সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে পারে।

আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি ‘মডেল হার্ডওয়্যার মান’ নামে একটি কাঠামো প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভিন্ন গবেষণাগার যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তরল স্থানান্তরকারী যন্ত্র, রোবটিক বাহু ও নমুনা বিশ্লেষণকারী যন্ত্রের মতো সরঞ্জামকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের প্রকাশিত পরীক্ষায় একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গবেষণাগারের একাধিক যন্ত্রের কাজ সমন্বয় করেছে। গবেষক নির্দেশনা দেওয়ার পর ব্যবস্থা পরীক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এরপর বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনা করে পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ধাপের পরামিতি পরিবর্তন করেছে।

এর ফলে গবেষণার এমন কিছু ধাপ স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হতে পারে, যেগুলো এখনো গবেষকদের হাতে করতে হয়। অ্যানথ্রপিকের লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে এমন গবেষণাগার তৈরি করা, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার পুনরাবৃত্তিমূলক ও যান্ত্রিক কাজ সামলাবে। গবেষকরা তখন পরীক্ষার নকশা, ফলের ব্যাখ্যা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো কাজে বেশি সময় দিতে পারবেন।

জীববিজ্ঞান নিয়ে অ্যানথ্রপিকের কাজ অবশ্য নতুন নয়। গত বছর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জীবনবিজ্ঞান গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

জুনে অ্যানথ্রপিক ‘ক্লদ বিজ্ঞান’ নামে একটি গবেষণা সহায়ক ব্যবস্থা চালু করে। এটি জীববিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, প্রোটিন গবেষণা, রাসায়নিক জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষকদের তথ্য খোঁজা, বিশ্লেষণ, গবেষণার ধাপ সাজানো এবং ফল যাচাইয়ে সহায়তা করতে পারে। ব্যবস্থাটিতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার ও গবেষণা সরঞ্জামের সঙ্গে সংযোগের সুবিধাও রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া অ্যানথ্রপিক জীববিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কো-এফিশিয়েন্ট বায়ো অধিগ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, শেয়ারভিত্তিক ওই লেনদেনের মূল্য প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলার। অ্যানথ্রপিক অধিগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও লেনদেনের মূল্য প্রকাশ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অধিগ্রহণের মাধ্যমে ওষুধ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা বাড়বে।

অ্যানথ্রপিকের পরিচালনা পর্ষদেও যুক্ত হয়েছেন নোভার্টিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ভাস নারাসিমহান। চলতি বছরের এপ্রিলে তাঁর নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, স্বাস্থ্য ও জীবনবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এমন রোগ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, যেসব ক্ষেত্রে প্রচলিত ওষুধ গবেষণায় বাণিজ্যিক আগ্রহ তুলনামূলক কম।

প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জটিল রোগের জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য ওষুধের লক্ষ্য শনাক্ত এবং নতুন অণুর নকশায় গবেষণার সময় কমাতে পারে। বিরল রোগ নিয়ে গবেষণাতেও প্রতিষ্ঠানটি আলাদা কর্মসূচি চালু করেছে।

তবে অ্যানথ্রপিক এখনই রোগীর ওপর ওষুধ পরীক্ষার পর্যায়ে যাচ্ছে না। রয়টার্সকে প্রতিষ্ঠানটির জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বলেছেন, আপাতত তারা মানবদেহে ওষুধের পরীক্ষায় যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে প্রতিযোগিতা ও বাণিজ্যিক সীমারেখার কথা বলা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তব গবেষণাগারের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে গবেষণার গতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এর অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

অ্যানথ্রপিক নিজেই গত বছর জীববৈজ্ঞানিক ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা যায়, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জীববিজ্ঞানের জটিল তথ্য ও গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে মানুষের সক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণেই ক্ষতিকর জীববৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।

সেপ্টেম্বরেও অ্যানথ্রপিক জানায়, তাদের ব্যবস্থার অপব্যবহার করে ক্ষতিকর জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার চেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে।

অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষণাগারের যন্ত্রের সরাসরি সংযোগ নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এতে শুধু তথ্য বা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা নয়, বাস্তব পরীক্ষার কিছু ধাপ পরিচালনার সক্ষমতাও যুক্ত হচ্ছে।

অ্যানথ্রপিক অবশ্য বলছে, গবেষণাগারে মানুষের তত্ত্বাবধান অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, বাস্তব গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নিরাপত্তা বজায় রেখেই এর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ফলে অ্যানথ্রপিকের নতুন গবেষণাগারকে শুধু ওষুধ আবিষ্কারের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ থেকে বাস্তব পরীক্ষার পর্যায়ে নেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। সেই পরিবর্তন সফল হলে ওষুধ গবেষণার গতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে গবেষণাগারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতার সীমা ও নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *