এআই সহকারীর আচরণ বা কথোপকথনের ধরন হঠাৎ বদলে গেলে কিছু ব্যবহারকারীর মধ্যে দুঃখ, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এমনই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় এআই সহকারীর সঙ্গে কথোপকথন করতে করতে কিছু ব্যবহারকারী এসব ব্যবস্থার সঙ্গে এমন আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করেন, যা আচরণগত পরিবর্তনকে নিছক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে অনুভব করতে পারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ সাময়িকীতে।
গবেষণার প্রধান লেখক জুলিয়ান ডি ফ্রেইটাস জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই সঙ্গী ব্যবহারকারীদের আলোচনা পর্যবেক্ষণের সময় গবেষকেরা একটি বিষয় লক্ষ্য করেন। একটি হালনাগাদের পর অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করছিলেন, তাঁদের পরিচিত এআই সঙ্গী যেন আর আগের মতো নেই। কেউ কেউ বলছিলেন, তাঁরা তাঁদের সঙ্গীকে হারিয়েছেন। কেউ আবার আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানাচ্ছিলেন।
গবেষকদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যবহারকারীদের ভাষার কারণে। তাঁরা দেখেন, অনেকে সাধারণ গ্রাহক অভিযোগের ভাষা ব্যবহার করছেন না। বরং প্রিয় কাউকে হারানোর পর মানুষ যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করে, তাঁদের বক্তব্যে তার মিল রয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যক্তিগত কথোপকথন চালাতে পারে। কিছু ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে এআই সঙ্গী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব কিংবা দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
নিয়মিত ব্যবহারের ফলে কোনো কোনো ব্যবহারকারীর কাছে এআই সহকারী কেবল তথ্য পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে থাকে না। সেটি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের একটি পরিচিত অংশে পরিণত হতে পারে। কেউ কেউ মানসিক সান্ত্বনা বা আশ্বাস পাওয়ার জন্যও এসব ব্যবস্থার কাছে ফিরে যান।
এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ধারাবাহিকতা। ব্যবহারকারী একই ধরনের ভাষা, স্মৃতি, প্রতিক্রিয়া ও কথোপকথনের ধরন প্রত্যাশা করতে পারেন। ফলে কোনো হালনাগাদে সেই আচরণ বদলে গেলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনটি তাঁদের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তনের মতো মনে হতে পারে।
গবেষকেরা দুটি বাস্তব হালনাগাদকে কেন্দ্র করে তাঁদের গবেষণা পরিচালনা করেন। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় রেপ্লিকা নামের একটি এআই সঙ্গী ব্যবস্থার কিছু সক্ষমতা হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের আগস্টে। সে সময় পূর্বঘোষিত জিপিটি-৫ প্রকাশ করা হয়। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় ঘটনাতেই কিছু ব্যবহারকারী এআই ব্যবস্থার আচরণ ও কথোপকথনের ধরনে পরিবর্তন অনুভব করেন।
গবেষকেরা সংশ্লিষ্ট হালনাগাদের আগে ও পরের ৩০ দিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশনা সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীদের অনুভূতি, আবেগ, সঙ্গ হারানোর অনুভব, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং পুরোনো সংস্করণে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয় শনাক্ত করা হয়।
তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি গবেষণার অংশ হিসেবে সংগৃহীত বক্তব্যের একটি অংশ গবেষণার দুজন লেখক নিজেরাও পর্যালোচনা করেন। এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা শ্রেণিবিন্যাস কতটা নির্ভুল, তা যাচাই করা হয়।
এর বাইরে প্রায় এক হাজার ৪৫০ জন উত্তরদাতাকে নিয়ে সাতটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এসব সমীক্ষায় এআই সঙ্গীর সঙ্গে মানুষের আবেগীয় সম্পর্ক এবং সেই সঙ্গী হারানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, এআই সহকারীর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তনের পর কিছু ব্যবহারকারীর বক্তব্যে দুঃখ, উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং মানসিক কষ্টের প্রকাশ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অনেকে পুরোনো সংস্করণ ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, কিছু ব্যবহারকারী তাঁদের এআই সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ককে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যা সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্পর্কের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত। তাঁরা এআই সঙ্গীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আবেগ ভাগাভাগি এবং কঠিন সময়ে সান্ত্বনা পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
তবে গবেষণার ফলাফল থেকে এ কথা বলা হচ্ছে না যে সব ব্যবহারকারী এআইয়ের সঙ্গে একই ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি করেন। বরং নির্দিষ্ট একটি অংশের ব্যবহারকারীর মধ্যে এমন সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার নকশা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। কোনো এআই সহকারীর আচরণ, স্মৃতি, কথোপকথনের ধরন বা সক্ষমতা পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ওপর সম্ভাব্য মানসিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন কি না, তা এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে যেসব ব্যবস্থা ব্যক্তিগত কথোপকথন এবং সঙ্গ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবহারকারীর কাছে ব্যবস্থাটি একটি সফটওয়্যার হলেও দীর্ঘদিনের কথোপকথন ও অভ্যাসের কারণে সেটির সঙ্গে তৈরি সম্পর্ক বাস্তব আবেগের জন্ম দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, মানুষের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই এই সম্পর্কের মানসিক ও নৈতিক দিক বোঝার প্রয়োজন বাড়বে। প্রযুক্তির পরিবর্তন কীভাবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও আবেগকে প্রভাবিত করে, ভবিষ্যতের গবেষণায় সেই বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেতে পারে।