ব্রিকসের একটি ‘সাধারণ মুদ্রা’ আসছে—এমন আলোচনা কয়েক বছর ধরেই চলছে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সেই মুদ্রা চালুর কোনো ঘোষণা আসেনি। এমনকি কোনো একক ব্রিকস পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মও অনুমোদন করা হয়নি।
তবে এর অর্থ আর্থিক সহযোগিতার উদ্যোগ থেমে গেছে—এমনও নয়। বরং নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ব্রিকস পেমেন্ট টাস্ক ফোর্স -এর আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে পেমেন্ট ও মেসেজিং চ্যানেলস-এর ইন্টারোপেরাবিলিটি এবং সদস্য দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিষ্পত্তি নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ব্রিকসের আর্থিক কৌশল এখন কোনো একক মুদ্রা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান মুদ্রা ও পেমেন্ট অবকাঠামোগুলোকে আরও কার্যকরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার দিকে এগোচ্ছে।
একটি সাধারণ মুদ্রা চালু করতে শুধু নতুন নোট বা ডিজিটাল টোকেন তৈরি করলেই হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বয়, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মতো জটিল বিষয়।
এর বিপরীতে, দুই বা একাধিক দেশের নিজস্ব মুদ্রা বজায় রেখেই তাদের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করা তুলনামূলকভাবে কম জটিল।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে তাই ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ পদ্ধতির বদলে জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিষয়ে কাজ চালানোর কথা বলা হয়েছে। ঘোষণাপত্রে একই সঙ্গে দ্রুত, কম খরচের, সহজলভ্য, দক্ষ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টের বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে। রয়টার্সের ২রা সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ রুবল ও রুপির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় ২২টি রুশ ও ১৭টি ভারতীয় ব্যাংক যুক্ত রয়েছে। সবারব্যাংক ইন্ডিয়া-এর প্রধান ইভান নোসভ জানান, দুই দেশের ৯০ শতাংশ লেনদেন ১০ মিনিটের মধ্যে এবং অর্ধেকের বেশি এক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে।
এই ব্যবস্থা কোনো সাধারণ ভারত-রাশিয়া মুদ্রা তৈরি করেনি। বরং দুই দেশের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করেই বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য একটি কার্যকর পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।
ব্রিকস-এর বৃহত্তর আলোচনায় এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থের পাশাপাশি অর্থপ্রদানের তথ্য বা মেসেজিং-ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে হয়। বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং ও ইন্সট্যান্ট পেমেন্ট ইন্সফ্রাসটাকচার যদি একে অপরের সঙ্গে সরাসরি বা মানসম্মত উপায়ে যোগাযোগ করতে পারে, তাহলে লেনদেনের সময় ও খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ব্রিকস-এর ঘোষণাপত্রে ঠিক এই জায়গাটিতেই পেমেন্ট এবং মেসেজিং চ্যানেলস-এর ক্রস-বর্ডার ইন্টারঅপারেবিলিটি নিয়ে কাজের কথা বলা হয়েছে। তবে ঘোষণাপত্রের ভাষা অনুযায়ী, এটি এখনো গবেষণা, আলোচনা ও বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরির পর্যায়ে রয়েছে; কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্রিকস-ওয়াইড পেমেন্ট নেটওয়ার্ক চালুর ঘোষণা সেখানে নেই।
এই ধারণাটি বোঝার জন্য প্রজেক্ট নেক্সাস একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নেক্সাস তৈরি করেছে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস-এর ইনোভেশন হাব। এর লক্ষ্য হলো বিভিন্ন দেশের ডোমেস্টিক ইন্সট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেমসকে একটি আদর্শ কাঠামোর মাধ্যমে যুক্ত করা। কোনো একটি দেশের পেমেন্ট সিস্টেমকে প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে সংযোগ করার পরিবর্তে একটি সাধারণ হাব-এর সঙ্গে সংযুক্ত করার ধারণা এতে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নেক্সাস গ্লোবাল পেমেন্টস নামে একটি আইনি সত্তা গঠন করে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দিকে এগোয়।
তবে নেক্সাস-কে ব্রিকস-এর প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ব্রিকস-এর বাইরে তৈরি একটি প্রযুক্তিগত মডেল, যা আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ইন্টারঅপারেবিলিটি-এর সম্ভাব্য কাঠামো বোঝাতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ প্রজেক্ট এমব্রিজ। এটি বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি বা সিবিডিসি ব্যবহার করে আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট-এর সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছে।
বিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, এমব্রিজ-এ একটি শেয়ারড টেকনিক্যাল প্ল্যাটফর্ম-এর মাধ্যমে পার্টিসিপেটিং সেন্ট্রাল ব্যাংকস এবং কমারশিয়াল-এর মধ্যে ক্রস বর্ডার ট্রানজাকশন পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট বা এমভিপি পর্যায়ে পৌঁছায়।
২০২২ সালের একটি পাইলট-এ হংকং, থাইল্যান্ড, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০টি ব্যাংক ১৬৪টি পেমেন্ট ও ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজাকশন পরিচালনা করে, যার মোট মূল্য ছিল ২২ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
তবে এটিও স্পষ্ট করা জরুরি—এমব্রিজ কোনো ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেম নয়। বিআইএস নিজেই ২০২৪ সালে জানিয়েছিল, প্রকল্পটি ব্রিকস-এর জন্য তৈরি হয়নি এবং এটিকে ‘ব্রিকস ব্রিজ’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ব্রিকস-এর সম্ভাব্য নতুন মুদ্রা নিয়ে আলোচনায় ‘ইউনিট’ নামটিও এসেছে। কিন্তু এটিকে ব্রিকস-এর আনুষ্ঠানিক মুদ্রা হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর।
ইউনিট ফাউন্ডেশন-এর নিজস্ব নথিতে ৪০ শতাংশ সোনা এবং ৬০ শতাংশ বিভিন্ন কনভার্টিবল ফিয়াট কারেন্সি-ভিত্তিক রিজার্ভ বাস্কেট-এর কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত ইউনিট-কে একটি সেটেলমেন্ট বা ইউনিট অফ একাউন্ট কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত কোনো সরকারি মুদ্রা নয়। একটি পৃথক গবেষণা ও প্রস্তাবিত প্রকল্প হিসেবে এর অবস্থান বোঝা উচিত। ব্রিকস-এর ২০২৬ সালের নয়াদিল্লী ঘোষণাতেও এমন কোনো ইউনিট গ্রহণ বা চালুর ঘোষণা নেই।
এখানে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ শব্দটি ব্যবহার করার সময়ও কিছু সতর্কতা দরকার।
ব্রিকস-এর স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে মার্কিন ডলারকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বরং এর অর্থ হতে পারে—দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় কোনো মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় মুদ্রায় সরাসরি সেটেলমেন্ট-এর সুযোগ বাড়ানো।
একইভাবে, পেমেন্ট-সিস্টেম ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি হলে তা কোনো একটি নতুন মুদ্রা তৈরি না করেও আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণে ব্রিকসের বর্তমান উদ্যোগকে ‘একটি নতুন মুদ্রা দিয়ে ডলারকে প্রতিস্থাপন’ করার প্রকল্প হিসেবে দেখার চেয়ে ‘বহু মুদ্রা ও বহু পেমেন্ট অবকাঠামোর মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা’ হিসেবে দেখা বেশি সঙ্গত।
এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নও সহজ নয়। সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি, মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, মূলধন নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক বিধি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
তার ওপর আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থপাচারবিরোধী বিধি, নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, নিষ্পত্তি ঝুঁকি, ডেটা মানদণ্ড এবং বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক আবশ্যকতা যুক্ত।
তাই একটি কার্যকর ব্রিকস-বিস্তৃত পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত আন্তঃকার্যক্ষমতা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সমন্বয়।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র থেকে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—ব্রিকস এখনো কোনো একক মুদ্রার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। বরং পেমেন্ট টাস্ক ফোর্স-এর মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টের বাস্তবসম্মত সমাধান, পেমেন্ট ও মেসেজিং আন্তঃকার্যক্ষমতা এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এটি ধীরগতির পথ হতে পারে, কিন্তু এর লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট: একটি নতুন মুদ্রা তৈরির বদলে বিদ্যমান মুদ্রা ও পেমেন্ট অবকাঠামোর মধ্যে এমন সংযোগ তৈরি করা, যাতে সদস্য দেশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের মুদ্রায় কম খরচে ও দ্রুত বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারে।
অর্থাৎ, ব্রিকস-এর আর্থিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এখন আর ‘কবে নতুন মুদ্রা আসবে’ নয়। বরং প্রশ্নটি হলো—বিভিন্ন জাতীয় মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও পেমেন্ট নেটওয়ার্ককে কতটা কার্যকরভাবে একই আর্থিক জালে যুক্ত করা সম্ভব হবে।