জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির গল্প নিয়ে ঢাকায় শুরু হয়েছে আহমেদ রাসেলের আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘একটি বিছানা, একটি বাড়ি এবং কবর’। ৯ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে এ প্রদর্শনী চলবে। এতে উঠে এসেছে হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, বিলীন হয়ে যাওয়া কবরস্থান এবং জমির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের গল্প।
প্রদর্শনীটি শিল্পীর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ‘মেমরি’জ অব লস্ট ল্যান্ডস’ এর কিছু অংশ নিয়ে সাজানো হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এ প্রকল্পে আলোকচিত্র, পুরোনো পারিবারিক ছবি, ভিডিও ও হাতে লেখা বিবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে জলবায়ুজনিত স্থানচ্যুতির এমন কিছু ক্ষতি তুলে ধরা হয়েছে, যা শুধু অর্থনৈতিক হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না।
বাড়ি হারানোর সঙ্গে হারিয়ে যায় পরিচিত পরিবেশ, পারিবারিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার অনেক উপাদান। জমি হারানোর অর্থ তাই শুধু বসতভিটা হারানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের পরিচয়, শেকড় ও আপনজনের স্মৃতি।
প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের সংযোগ। নদীভাঙনে আহমেদ রাসেলের দাদির বাড়ি হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি তাঁর কাজের একটি কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গ। হারিয়ে যাওয়া বাড়ির স্মৃতি, একটি মাছের রূপক এবং বিলীন হয়ে যাওয়া কবরের বেদনা তাঁর আলোকচিত্রে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
‘নদী স্মৃতি ছাড়া সবকিছু কেড়ে নিয়েছে’—এই বক্তব্য প্রদর্শনীর মূল ভাবনাকে ধারণ করে। নদী ভৌত সম্পদ ও বসতি বিলীন করে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে যায়। সেই স্মৃতি কখনো পুরোনো ছবিতে, কখনো গল্পে, আবার কখনো হারানো স্থানের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতিতে বেঁচে থাকে।
শিল্পীর চাচার বিয়ের সময় তোলা দুটি পুরোনো আলোকচিত্রের রোল এ প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৮ সালে ধারণ করা এসব ছবিতে রয়েছে নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়া বাড়ির দৃশ্যমান স্মৃতি। পুরোনো ছবির সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোকচিত্রের সংযোগ অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে। এর ফলে একটি পরিবারের স্মৃতি বৃহত্তর সামাজিক ক্ষতির দলিল হয়ে উঠেছে।
প্রদর্শনীর ছবিতে নদীর তীর, ভাঙা সেতু, ডুবে যাওয়া স্থাপনা, ক্ষয়ে যাওয়া কবরস্থান ও জনশূন্য ভূদৃশ্যের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কোথাও মানুষ নৌকায় করে সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে। কোথাও নদীভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এসব দৃশ্য বিপর্যয়ের পাশাপাশি টিকে থাকার চেষ্টাকেও সামনে আনে।
কিছু ছবিতে মানুষকে দেখা যায় পরিবেশের বিশালতার তুলনায় খুব ছোট করে। কোথাও মানুষের অনুপস্থিতিই হয়ে উঠেছে ছবির প্রধান বক্তব্য। এভাবে শিল্পী শুধু ধ্বংসের দৃশ্য দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো একটি স্থান হারিয়ে গেলে সেখানে মানুষের দীর্ঘদিনের বসবাস ও সম্পর্কের কী পরিণতি হয়।
চিংড়ি খামারে প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে খেলা শিশুর ছবিতে পরিবেশগত সংকটের আরেকটি দিক সামনে আসে। এখানে লবণাক্ততা ও প্লাস্টিকদূষণের মতো সমস্যার সঙ্গে শিশুর দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। আবার বানিশান্তার যৌনকর্মীদের জীবন ও স্থানচ্যুতির প্রসঙ্গ দেখায়, বিপর্যয়ের মুখে সব মানুষের স্থানান্তরের সুযোগ সমান নয়।
প্রদর্শনীর ছবিতে রাতের দৃশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধকারের মধ্যে কৃত্রিম আলো, নির্জন স্থাপনা ও অনিশ্চিত পরিবেশ এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। অন্যদিকে সেপিয়া ও ম্লান রঙের ব্যবহার ছবিগুলোকে স্মৃতি ও সময়ের ক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অনেক ছবির ফাঁকা আকাশ, বিস্তৃত জলরাশি ও জনশূন্যতা হারানোর অনুভূতিকে আরও তীব্র করে।
আহমেদ রাসেলের কাজে আলোকচিত্র শুধু কোনো দৃশ্যের নথি নয়। এটি হারিয়ে যাওয়া স্থান ও মানুষের স্মৃতির সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। যে বাড়ি আর নেই, যে কবর নদীতে বিলীন হয়েছে, তার ছবি বর্তমানের মধ্যে অতীতের উপস্থিতি তৈরি করে।
প্রদর্শনীর বিন্যাসেও এ ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। সাদা দেয়ালে বিভিন্ন আকারের ফ্রেমে ছবিগুলো সাজানো হয়েছে। বড় ছবিগুলো দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাশাপাশি ছোট ছোট ছবির সারি কোনো ঘটনার বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরে।
একটি দেয়ালের কোণে ছোট আলোকচিত্রের সমাহার ও হাতে লেখা বাংলা বিবরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বিন্যাস ব্যক্তিগত দিনলিপি কিংবা পারিবারিক স্মৃতির সংগ্রহের কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে বিচ্ছিন্ন ছবিগুলো একত্র হয়ে হারিয়ে যাওয়া জীবন ও স্থানের একটি বিস্তৃত বিবরণ তৈরি করে।
প্রদর্শনীটির আলোচনায় ‘প্রত্যাশিত বিষণ্ণতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর অর্থ, কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার আগেই তার সম্ভাব্য অনুপস্থিতি নিয়ে শোক তৈরি হওয়া। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের কাছে এ অনুভূতি অপরিচিত নয়। আজ যে বাড়ি রয়েছে, আগামীকাল সেটি থাকবে কি না—এ অনিশ্চয়তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে।
শিল্পসমালোচক তাহমিদাল জামির পর্যবেক্ষণেও প্রদর্শনীর বিষণ্ণ আবহের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর পাঠ অনুযায়ী, ছবিগুলো দর্শককে এমন এক পৃথিবীর মুখোমুখি করে, যেখানে সুখ ও নিরাপত্তার পরিচিত ধারণাগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে প্রদর্শনীটির একটি সমালোচনামূলক দিকও রয়েছে। এখানে ক্ষয় ও শোকের উপস্থিতি প্রবল। মানুষের প্রতিরোধ, অভিযোজন কিংবা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে দর্শকের কাছে প্রশ্ন উঠতে পারে, জলবায়ু সংকটের অভিজ্ঞতা কি কেবল হারানোর গল্প, নাকি এর মধ্যে টিকে থাকার অন্য ভাষাও রয়েছে?
শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য সংকটের সহজ সমাধান দেখানোর চেয়ে ক্ষতির গভীরতা অনুভব করানোর দিকে বেশি মনোযোগী। এ কারণে প্রদর্শনীটি সরাসরি কোনো সমাধানের প্রস্তাব না দিয়ে দর্শককে নিজের অবস্থান ও দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এসব সংকটের পেছনে রয়েছে স্থানীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিবেশগত পরিবর্তন। কিন্তু ক্ষতির অভিজ্ঞতা সবার জন্য এক নয়।
যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তাঁদের পক্ষে নতুন জায়গায় বসতি গড়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। অন্যদিকে দরিদ্র পরিবার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানান্তর মানে জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ হারানোর ঝুঁকি। আহমেদ রাসেলের কাজ এ বৈষম্যকে সরাসরি পরিসংখ্যানের ভাষায় ব্যাখ্যা না করেও মানুষের জীবন ও হারিয়ে যাওয়া স্থানের মধ্য দিয়ে তা উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।
প্রদর্শনীটি জলবায়ু সংকটের দায় ও পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বৈশ্বিক পরিবেশগত পরিবর্তনে যেসব জনগোষ্ঠীর অবদান তুলনামূলক কম, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির ভার তাদেরই বহন করতে হয়। এই বাস্তবতায় নদীভাঙনে হারানো একটি বাড়ি কিংবা বিলীন হয়ে যাওয়া একটি কবরস্থান বৃহত্তর বৈশ্বিক সংকটের অংশ হয়ে ওঠে।
আহমেদ রাসেলের প্রদর্শনীতে আলোকচিত্রের সঙ্গে পুরোনো নথি, পারিবারিক স্মৃতি, ভিডিও ও হাতে লেখা বিবরণের সমন্বয় ঘটেছে। ফলে এটি নিছক আলোকচিত্রের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন মাধ্যমের সংযোগ দর্শককে একটি স্থান হারানোর অর্থ নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
প্রদর্শনীর শিরোনামে বিছানা, বাড়ি ও কবরের পাশাপাশি অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। বিছানা ব্যক্তিগত পরিসর ও দৈনন্দিন জীবনের প্রতীক হতে পারে। বাড়ি পরিবার, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। আর কবর মৃত ব্যক্তির স্মৃতি, পারিবারিক ইতিহাস ও শিকড়ের ধারণাকে সামনে আনে। এই তিনটি অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে স্থানের সম্পর্কের একটি বিস্তৃত পরিসর তৈরি হয়।
আহমেদ রাসেলের ‘একটি বিছানা, একটি বাড়ি এবং কবর’ প্রদর্শনী তাই জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান ক্ষতির পাশাপাশি অদৃশ্য ক্ষতিগুলোকেও সামনে আনে। ভৌত স্থাপনা হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে যুক্ত জীবন, স্মৃতি ও পরিচয়ের কী হয়—প্রদর্শনীটি সেই প্রশ্ন তোলে।
নদীভাঙন থামানোর ক্ষমতা আলোকচিত্রের নেই। হারিয়ে যাওয়া বাড়ি কিংবা কবরও ছবি দিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু ছবি হারানোর সাক্ষ্য ধরে রাখতে পারে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগাযোগ তৈরি করতে পারে। সেই অর্থে প্রদর্শনীটি কেবল ধ্বংসের নথি নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া স্থানগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে স্মরণ করার একটি প্রচেষ্টা।
আরো পড়ুন : প্রতিমা থেকে পাটের ভাস্কর্য, ‘মা’কে ঘিরে শিল্পের বহুরূপী ভাষা