প্রবাসীদের সুরক্ষায় এনপিএর সাত দফা দাবি

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনায় প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় শাহবাগে এনপিএর বিক্ষোভ সমাবেশ

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের শিরশ্ছেদের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা, প্রবাসীদের আইনি সহায়তা এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। সমাবেশ থেকে প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারের কাছে সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৩শে অক্টোবর) বিকেল চারটায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, গবেষক, আন্দোলনকর্মী এবং সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা এক প্রবাসী শ্রমিক বক্তব্য দেন।

এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য সজীব তানভীরের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম, শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা, জনরাষ্ট্র আন্দোলনের সংগঠক সরদার আমিরুল ইসলাম, অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনুভা জাবীন, এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য অনিক রায়, রাজনৈতিক আন্দোলনকর্মী মুশফিক উস সালেহীন এবং সংগঠনটির ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক তাহমিদ তিশাদ খান। সৌদি আরবে কারাবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন দেশটি থেকে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিক মুকুল শেখ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মাধ্যম নন; তাঁদের জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তাঁদের অভিযোগ, নজরুল ইসলাম ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে থাকলেও তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিবাদ না আসার অভিযোগও তোলেন তাঁরা।

বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পরিবর্তে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিহত শ্রমিকদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। ঘটনাটিকে ‘পাপের লাশ’ হিসেবে বর্ণনা করার মতো বক্তব্য প্রবাসী শ্রমিকদের মর্যাদাহানি করেছে।

সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে সাত দিনের মধ্যে প্রবাসীদের সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি জানান হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, “প্রবাসীদের ব্যাপারে আপনারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, এইটা আগামী সাত দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে ও প্রবাসীদের জানাতে হবে।”

তাজনুভা জাবীন ও মাহা মির্জা বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা, তাঁদের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সমাবেশে এনপিএর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরেন। প্রথম দাবিতে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এবং তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।

সংগঠনটি দাবি করেছে, ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানাতে হবে। একই সঙ্গে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে সব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

এ ছাড়া জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাইয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে এনপিএ। বিশেষ করে জেদ্দা কনস্যুলেট থেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো স্মারকলিপিতে অভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য কেন ছিল না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছে সংগঠনটি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ জানানোর উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।

দ্বিতীয় দাবিতে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার দায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এনপিএর দাবি, এই ব্যর্থতাকে প্রবাসীদের জন্য ‘শিক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করা প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং নিহত শ্রমিকদের বিষয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামরুজ্জামান রতনকে সংসদে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

তৃতীয় দাবিতে সৌদি আরবসহ শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলোতে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এনপিএর বিবৃতিতে ব্র্যাকের তথ্য উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, অন্তত ৭০ হাজার নারী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় ৮০০ জনের মরদেহ দেশে ফিরেছে আত্মহত্যার ঘটনায়। সংগঠনটি আরও অভিযোগ করেছে, নির্যাতনের ঘটনায় সৌদি নিয়োগকর্তাদের শাস্তির নজির নেই।

এনপিএ বলেছে, নির্যাতনের অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তা সম্ভব না হলে সেসব দেশে নারী শ্রমিক পাঠানো স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধারব্যবস্থা, দ্রুত আইনি সহায়তা ও নিরাপদে দেশে ফেরার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।

চতুর্থ দাবিতে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য দেশগুলোতে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষিত শ্রমকল্যাণ কর্মকর্তা এবং আইনজীবী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব খাতে বরাদ্দ বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সব দূতাবাস ও কনস্যুলেটে বিনা মূল্যে ফোন করে যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং ২৪ ঘণ্টা চালু জরুরি সহায়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে শ্রমিকের মৃত্যু, দুর্ঘটনা, নির্যাতন, আটক, নিখোঁজ হওয়া, ক্ষতিপূরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের দাবি করেছে এনপিএ।

পঞ্চম দাবিতে দালালচক্র, মানবপাচার, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং প্রতারণামূলক নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রতারিত শ্রমিকদের আইনি প্রতিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিদেশে যাওয়ার আগে অভিবাসীদের নাগরিক অধিকার, দূতাবাসের সহায়তা এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রতিকার পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ষষ্ঠ দাবিতে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে এমন কার্যকর দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, প্রচণ্ড গরমে কাজের সময়সীমা, বিশ্রাম, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত হয়।

সংগঠনটি ২০১৯ সালে চালু হওয়া বীমা ব্যবস্থায় আগে থেকে বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বীমার আওতায় আনা এবং বীমার অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার দাবি জানিয়েছে।

সপ্তম দাবিতে বিদেশে শ্রমিক উদ্ধার, অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় সময়, বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির কথা বলা হয়েছে।

এনপিএর প্রস্তাব, দূতাবাস, কনস্যুলেট, শ্রমকল্যাণ শাখা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমকল্যাণ কর্মকর্তা এবং আইনজীবীদের কাজ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এসব মূল্যায়নের ফল নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসে। সাত দফা দাবির মধ্য দিয়ে এনপিএ প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে।

 

আরো পড়ুন : মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, বিচারপ্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *