বিশ্ববিদ্যালয় যখন কনসার্ট হল, তখন কোথায় জ্ঞানচর্চা?

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কনসার্ট উপভোগ করছেন শিক্ষার্থীরা; উচ্চশিক্ষায় বিনোদন ও জ্ঞানচর্চার ভারসাম্য নিয়ে প্রতীকী চিত্র

 

মঞ্চে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, সামনে হাজারো শিক্ষার্থী। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বা গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক আলোচনা আয়োজিত হলে উপস্থিতি থাকে তুলনামূলকভাবে কম। এই বৈপরীত্য কি কেবল শিক্ষার্থীদের পছন্দের পার্থক্য, নাকি উচ্চশিক্ষার অগ্রাধিকারেও কোনো পরিবর্তন ঘটছে? বিনোদনের বিরোধিতা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনোদন ও জ্ঞানচর্চার ভারসাম্য নিয়ে এই প্রশ্ন জরুরি।

দেশের কোন একটি  বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন উৎসব দিবসের কথা ভাবুন। ক্যাম্পাসজুড়ে গান, বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ, মঞ্চে জনপ্রিয় শিল্পী। সামনে হাজারো শিক্ষার্থী, অনেকের হাতে মুঠোফোন। চারপাশে উৎসবের আমেজ।

একই ক্যাম্পাসে কোন বিষয় ভিত্তিক একটি আলোচনা সভা হলে। সেখানে উপস্থিত থাকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন ; তাঁদের মধ্যে বেশীরভাগই সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তা যাদের উপস্থিত থাকতেই হতো।

এই উদাহরণটি যদি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—একই শিক্ষার্থীরা একটি অনুষ্ঠানে বিপুল আগ্রহ দেখালেও অন্যটিতে কেন অনাগ্রহী থাকেন?

১৮১০ সালে বার্লিনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি পরে যার নাম হলো হামবোল্ড্ট ইউনিভার্সিটি। আধুনিক উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। প্রুশীয় শিক্ষাসংস্কারক উইলহেল্ম ফন হামবোল্টের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাদান ও গবেষণার সমন্বিত ধারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।

এই ধারণার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষক শুধু বিদ্যমান জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করবেন না; বরং নতুন জ্ঞান অনুসন্ধানেও যুক্ত থাকবেন। শিক্ষার্থীরাও কেবল মুখস্থ করে পরীক্ষা দেবেন না, প্রশ্ন করবেন, যুক্তি বিশ্লেষণ করবেন এবং গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশে অংশ নেবেন।

অবশ্য আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশে হামবোল্টের পাশাপাশি আরও অনেক ঐতিহাসিক ধারা ও চিন্তাবিদের অবদান রয়েছে। তবু গবেষণা, শিক্ষাদান ও মুক্ত অনুসন্ধানের সমন্বয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই আদর্শকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে? তাদের অনুষ্ঠান, অর্থ ব্যয়, শিক্ষক মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি সুযোগ-সুবিধায় জ্ঞানচর্চা কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসব, সমাবর্তন কিংবা বার্ষিক আয়োজনে জনপ্রিয় শিল্পী, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ ও বিনোদনজগতের পরিচিত মুখদের আমন্ত্রণ জানানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাঁরা শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেন, সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করেন এবং ক্যাম্পাসজীবনে বৈচিত্র্য আনেন।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এসব আয়োজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে, অথচ গবেষক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, লেখক ও গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদদের বক্তৃতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা, দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ ও সমসাময়িক সমাজ নিয়ে বক্তৃতা ও আলোচনা আয়োজিত হয়। উদাহরণ হিসেবে ট্যানার লেকচারসের কথা বলা যায়, যা হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

এসব আয়োজনের গুরুত্ব শুধু বক্তার খ্যাতিতে নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীরা যেন ভিন্নমত শোনার, কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার এবং নিজেদের ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ পান।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি গবেষক, চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করা সম্ভব। এতে বিনোদনের সুযোগ কমবে না; বরং ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর বিস্তৃত হবে।

বর্তমান সময়কে প্রায়ই মনোযোগের অর্থনীতির যুগ বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের জগতে মানুষের মনোযোগ একটি মূল্যবান সম্পদ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীদের যত বেশি সময় নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে পারে, তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনাও তত বাড়ে।

এ ধরনের পরিবেশে দ্রুত আকর্ষণ তৈরি করা, আবেগ জাগানো এবং বারবার ব্যবহারকারীকে ফিরিয়ে আনার জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়। ছোট ভিডিও, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বিষয়বস্তু দেখানো এবং একের পর এক নতুন বিষয় সামনে আনার প্রবণতা এর অংশ।

মনোযোগ নিয়ে গবেষণায় একটি বহুল আলোচিত তথ্য হলো, কম্পিউটার বা পর্দায় একজন মানুষের মনোযোগ এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে সরে যাওয়ার গড় ব্যবধান ২০০৪ সালের প্রায় আড়াই মিনিট থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে কমে প্রায় ৪৭ সেকেন্ডে নেমে এসেছিল। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাক্ষাৎকারে গবেষক গ্লোরিয়া মার্ক এই পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে এই ৪৭ সেকেন্ডকে তরুণদের সার্বিক মনোযোগের স্থায়িত্ব বলা ভুল হবে। এটি নির্দিষ্ট গবেষণায় পর্দায় মনোযোগ পরিবর্তনের ব্যবধানসংক্রান্ত একটি পরিমাপ; এর অর্থ এই নয় যে মানুষ মাত্র ৪৭ সেকেন্ড কোনো বক্তৃতা শুনতে বা কোনো বিষয় বুঝতে পারে।

তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। যখন শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত দ্রুতগতির ডিজিটাল বিষয়বস্তুর মধ্যে সময় কাটান, তখন দীর্ঘ বক্তৃতা, জটিল গবেষণা কিংবা ধীরগতির চিন্তায় মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তাঁদের কী ধরনের সহায়তা দরকার?

এখানে শিক্ষার্থীদের এককভাবে দোষারোপ করা সমাধান নয়। মনোযোগের অভ্যাস গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত পছন্দ, শিক্ষার পরিবেশ, সামাজিক অভ্যাস এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের সম্মিলিত প্রভাবে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা, প্রশ্নোত্তর, কর্মশালা ও আলোচনাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কি শুধু তাঁদের আগে থেকেই পছন্দের বিষয়গুলো সামনে আনা?

শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো মানুষের পরিচিত জগতের বাইরে নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সেই জায়গাটায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে তারা কখনো যেতে চায়নি। তাদের সেইসব বই পড়াতে, যে বই তারা নিজে থেকে কখনো হাতে নিতো না। তাদের সেইসব চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করাতে, যে চিন্তা তাদের আরামদায়ক বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে।
ফ্রান্সের দার্শনিক পিয়ের বুরদিঁ বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটা ‘ফিল্ড অফ পাওয়ার’। এখানে শুধু জ্ঞান নয়, ক্ষমতাও কাজ করে। কোন জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোনটাকে নয়—এটাও একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

আর যখন বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেয় যে একজন গবেষকের বক্তৃতার চেয়ে একজন গায়কের কনসার্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন তারা আসলে একটা রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে—এই সমাজে জ্ঞানের চেয়ে বিনোদনের মূল্য বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ জ্ঞানচর্চার ফল সব সময় সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হয় না। গবেষণার একটি প্রশ্নের উত্তর পেতে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর লাগতে পারে। কোনো তত্ত্ব বা আবিষ্কারের গুরুত্বও অনেক সময় পরে বোঝা যায়।

শিক্ষার্থীদের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহের পেছনে সামাজিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতির বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার। বন্ধুদের সঙ্গে কনসার্টে যাওয়া, পরিচিত শিল্পীর সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া তরুণদের সামাজিক জীবনের অংশ।

এগুলোকে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, দলগত কাজ এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতাও শিক্ষার্থীদের বিকাশে ভূমিকা রাখে।

তবে সমস্যা দেখা দিতে পারে যখন সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগই কোনো কর্মকাণ্ডের মূল্য নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে। একটি গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের তুলনায় কোনো বড় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি যদি বেশি দৃশ্যমান স্বীকৃতি এনে দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের সময় ও আগ্রহের বণ্টনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

চাকরির বাজারও এখানে প্রাসঙ্গিক। নিয়োগদাতারা অনেক ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক ফল নয়, নেতৃত্ব, যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজ ও অন্যান্য অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করেন। ফলে ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবা ও অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব গবেষণা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার বিকল্প নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। প্রতিষ্ঠানের সুনাম গড়ে ওঠে শুধু বড় অনুষ্ঠান কিংবা পরিচিত মুখের উপস্থিতিতে নয়; গবেষণার মান, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকতার দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং সমাজে জ্ঞানের অবদানের ওপরও।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড বা পরিচিতি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তা যেন প্রতিষ্ঠানের মূল শিক্ষাগত উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচিতি পাওয়া দোষের নয়। একজন শিক্ষক টেলিভিশনে আলোচনা করতে পারেন, বই লিখতে পারেন, পডকাস্টে অংশ নিতে পারেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জটিল বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এসব কাজের মাধ্যমে জ্ঞান বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছায়।

সমস্যা তখনই, যখন জনপ্রিয়তাকে গবেষণার মানের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন শিক্ষকের অনুসারীর সংখ্যা, গণমাধ্যমে উপস্থিতি কিংবা পরিচিতি তাঁর গবেষণার গুণমানের নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়। একইভাবে, প্রচারের বাইরে থাকা কোনো গবেষককে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবারও কারণ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গবেষণার মান, শিক্ষাদানের দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের বিকাশে অবদান, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষমতা এবং সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক কাজকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

একই সঙ্গে জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার দক্ষতাও মূল্যবান। লক্ষ্য হওয়া উচিত গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা—একটিকে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী বানানো নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্ট হবে কি না, প্রশ্নটি আসলে তা নয়। অবশ্যই হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেয়, শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করায় এবং ক্যাম্পাসে সম্মিলিত অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করে।

আসল প্রশ্ন হলো, এসব আয়োজনের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার জন্য কী করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত উন্মুক্ত বক্তৃতা, গবেষণা উপস্থাপনা, বিতর্ক, বই আলোচনা, বিজ্ঞান উৎসব ও প্রশ্নোত্তর পর্ব আয়োজন করতে পারে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে এসব অনুষ্ঠানের বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপনার ধরন এবং প্রচার কৌশলেও নতুনত্ব আনা সম্ভব।

গবেষকদের বক্তব্যকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা এবং জটিল বিষয় নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করা জ্ঞানকে হালকা করে দেওয়া নয়। বরং জ্ঞানকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি উপায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে যেমন কনসার্টের স্থান থাকবে, তেমনি থাকবে গবেষণা ও চিন্তাবিষয়ক আয়োজনের নিয়মিত স্থান। আর এসব উদ্যোগের সাফল্য বিচার করতে হবে শুধু উপস্থিতির সংখ্যা দিয়ে নয়; শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, আলোচনার মান এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত প্রভাব দিয়েও।

১৯১৭ সালে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ‘বিজ্ঞান: একটি ব্রত হিসেবে’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দেন, যা পরে ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বিজ্ঞানচর্চার অনিশ্চয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং জ্ঞানের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেন।

বিজ্ঞান ও গবেষণার পথ তাৎক্ষণিক স্বীকৃতির নিশ্চয়তা দেয় না। কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। কোনো গবেষণা জনপ্রিয় না হলেও তা ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু জনপ্রিয় চাহিদা পূরণ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের এমন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো, যেগুলোর উত্তর সহজ নয়। তাদের শেখানো, কীভাবে যুক্তি যাচাই করতে হয়, ভিন্নমত শুনতে হয় এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নিজের ধারণা সংশোধন করতে হয়।

একটি কনসার্টে হাজারো শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক জীবনের প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা কতটা শক্তিশালী, তা বুঝতে হলে আরও কিছু প্রশ্ন করতে হবে: কতজন শিক্ষার্থী গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন? কতটা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলতে পারছেন? শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন জ্ঞান তৈরির সুযোগ কতটা রয়েছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সাফল্য নির্ভর করে এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে আনন্দের পাশাপাশি কৌতূহল, যুক্তি, গবেষণা ও চিন্তার স্বাধীনতাও বিকশিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কনসার্ট হল হয়ে যাচ্ছে কি না, তার উত্তর শুধু একটি অনুষ্ঠানের ভিড় দেখে দেওয়া যাবে না। উত্তর খুঁজতে হবে প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার, গবেষণার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তার অবদান দেখে।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু তার ভবন, সুনাম কিংবা বড় আয়োজন নয়—তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মুক্তভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *