ইউরোপে ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসন নিয়ে বাড়ছে উগ্র ডানপন্থার রাজনীতি

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং উগ্র ডানপন্থার উত্থানের চিত্র।

ইউরোপে ইসলাম ও মুসলিম অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন এবং উগ্র ডানপন্থার উত্থান। ফলে ইসলামকে ঘিরে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে—যার অনেক দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিসংখ্যানের বড় ফারাক রয়েছে।

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে ৬ই  সেপ্টেম্বরের রাজ্য নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি—এএফডি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। দলটি ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) থেকে অনেক এগিয়ে যায়। এটি রাজ্যটিতে দলটির ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিই এএফডির প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়। দলটির রাজনীতিতে মুসলিম অভিবাসন, ইসলাম এবং তথাকথিত ‘ইসলামায়ন’ নিয়ে কঠোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু ইসলামবিরোধী মনোভাব দিয়েই স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল ব্যাখ্যা করা যায় না। পূর্ব জার্মানির অর্থনৈতিক বৈষম্য, জনসংখ্যা হ্রাস এবং মূলধারার রাজনীতির প্রতি অসন্তোষও এএফডির সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে।

একই সপ্তাহে ব্রিটেনের ডোভারে দেখা গেছে আরেকটি দৃশ্য। শত শত মুখোশধারী অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী বন্দরমুখী সড়ক অবরোধ করে। তাদের অনেকে কালো পোশাক ও বালাক্লাভা পরেছিলেন। তারা ‘ স্টপ দ্য বোটস্’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। ‘ক্রাইস্ট ইজ কিং’ স্লোগানও শোনা যায়। বিক্ষোভের কারণে ডোভার বন্দরের প্রবেশপথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

বিক্ষোভের সঙ্গে ‘প্যাট্রিয়ট প্ল্যার্টফর্ম ’ নামের একটি উগ্র ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে। পরে পোর্টসমাউথেও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়। ব্রিটিশ সরকার এসব কর্মকাণ্ডকে ভয় দেখানো ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী আচরণ হিসেবে নিন্দা করেছে।

ডোভারের ঘটনাটি শুধু অভিবাসনবিরোধী প্রতিবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সেখানে খ্রিস্টীয় জাতীয়তাবাদ, মুসলিমবিরোধী বক্তব্য এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনের প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। এমনকি পুলিশের কাছে আগেই সম্ভাব্য সহিংসতার তথ্য পৌঁছেছিল বলে পরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ফ্রান্সে ইসলামি পোশাক নিয়ে বিতর্ক আরও পুরোনো। দেশটির ডানপন্থী রাজনীতিতে জনসমক্ষে হিজাব নিষিদ্ধ করার দাবি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সিএসএ পরিচালিত এক জরিপে ৬০ শতাংশ ফরাসি নাগরিক জনসমক্ষে ইসলামি হিজাব নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ৫৩ শতাংশ জরিপ-উত্তরদাতা এ ধরনের পোশাক পরলে জরিমানার পক্ষেও মত দিয়েছেন।

এটি অবশ্য সরাসরি প্রমাণ করে না যে ৬০ শতাংশ ভোটার মেরিন ল্য পেনের ব্যক্তিগত প্রস্তাবকে সমর্থন করছেন। তবে জরিপটি ফ্রান্সে ইসলামি পোশাক নিষিদ্ধ করার ধারণার উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন দেখায়।

ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠী নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো ‘ইসলামায়ন’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’, ‘নো-গো জোন’ এবং ইউরোপে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার মতো নানা তত্ত্ব।

কিন্তু এসব দাবির অনেকটাই বাস্তব পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না। ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠী বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তারা এখনও মোট জনসংখ্যার সংখ্যালঘু। ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠীর আকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণাগুলোও বিভিন্ন পরিস্থিতির ভিত্তিতে ভিন্ন পূর্বাভাস দেয়। তাই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সরাসরি ইউরোপের ‘দখল’ বা ‘প্রতিস্থাপন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজন্মগত পরিবর্তন। ইউরোপের বহু মুসলিম পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম স্থানীয় সমাজ, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের পরিচয়ের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি জাতীয় ও ইউরোপীয় পরিচয়ও তৈরি হচ্ছে।

ব্রিটেনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের শিক্ষাগত অগ্রগতি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার হার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। একই তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের হার ছিল এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

অর্থাৎ, মুসলিম বা অভিবাসী পরিবারগুলোর পরবর্তী প্রজন্মকে শুধু বিচ্ছিন্ন ও সমাজবিরোধী জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

এখানে অবশ্য অন্য একটি বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। ইউরোপের সব মুসলিমই উদারনৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে পুরোপুরি একমত—এমন দাবিও সঠিক নয়। ২০১৬ সালের একটি ব্রিটিশ জরিপে ৫২ শতাংশ মুসলিম উত্তরদাতা বলেছেন, ব্রিটেনে সমকামিতা বৈধ হওয়া উচিত নয়। একই জরিপে ৮৬ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিম বলেছেন, তারা ব্রিটেনের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক অনুভব করেন। ৮৮ শতাংশ বলেছেন, মুসলিমদের বসবাসের জন্য ব্রিটেন ভালো দেশ।

এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখা জরুরি।

কারও সামাজিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষণশীল হওয়া এবং সহিংস উগ্রবাদে যুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু সেটিকে সরাসরি নিরাপত্তা-হুমকি বা সন্ত্রাসবাদের সমার্থক হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ দুর্বল হয়ে যায়।

এই কারণেই ‘ইসলাম’ এবং ‘ইসলামিজম’-এর মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম একটি ধর্মীয় বিশ্বাসব্যবস্থা। অন্যদিকে ইসলামিজম বলতে সাধারণত এমন রাজনৈতিক মতাদর্শকে বোঝানো হয়, যেখানে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে নির্দিষ্ট ইসলামী রাজনৈতিক নীতির অধীনে পরিচালনার লক্ষ্য থাকে।

ইউরোপে ইসলাম নিয়ে বাস্তব কিছু প্রশ্ন অবশ্যই আছে। সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, নারী-পুরুষের সমতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অভিবাসীদের সামাজিক সংহতি—এসব নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর যদি পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখার মাধ্যমে খোঁজা হয়, তাহলে উল্টো ফল হতে পারে।

গণহারে অভিবাসী বিতাড়ন, মুসলিমদের আলাদা করে দেখা বা ধর্মীয় পোশাকের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। এর ফলে মূলধারার সমাজের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি এই ক্ষোভকে আরও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। ডোভারের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

ইউরোপের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘ইসলাম কি পশ্চিমা মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?’—এমন সরল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কীভাবে একটি বহুধর্মীয় ও বহুজাতিক সমাজে নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সামাজিক সংহতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা যায়।

বাস্তবতা হলো, ইউরোপের মুসলিম জনগোষ্ঠী একক কোনো রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ব্লক নয়। তাদের মধ্যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রজন্মগত বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে তাদের সবাইকে একই রাজনৈতিক পরিচয়ের অধীনে ফেলা যেমন ভুল, তেমনি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করাও ভুল।

ইউরোপের আসল চ্যালেঞ্জ তাই ইসলামকে ভয় পাওয়া নয়। চ্যালেঞ্জ হলো উগ্রবাদ মোকাবিলা করা, অভিবাসনকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা এবং একই সঙ্গে কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের কাঠগড়ায় না দাঁড় করানো।

কারণ রাজনৈতিক আতঙ্ক যখন বাস্তবতার জায়গা দখল করে, তখন সমস্যার সমাধান হয় না। বরং বিভাজন আরও গভীর হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *