বহুমেরুকরণ ও বৈশ্বিক শাসন সংস্কারে জোর দিলেন সি চিন পিং

এসসিও প্লাস সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ‘শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) প্লাস’ সম্মেলনে বিশ্বব্যবস্থাকে আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক ও ন্যায্য করার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের ভূমিকা জোরদার এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

কিরগিজস্তান সময় ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিশকেকের হারমনি প্রাসাদে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘সমানুপাতিক ও সুশৃঙ্খল বিশ্ব বহুমেরুকরণের যৌথ পোষণ এবং আরও ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত বৈশ্বিক শাসন বাস্তবায়ন’ শীর্ষক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন সি চিন পিং।

চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্ব বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আধিপত্যবাদ, একতরফাবাদ ও সংরক্ষণবাদ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করছে। তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ শক্তির রাজনীতি বা সংঘাত চায় না। তারা নিজেদের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিষয়ে সমান অধিকার ও ভূমিকা নিশ্চিত করতে চায়।

তার ভাষায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন এসেছে। তাই বিশ্ব বহুমেরুকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখন আর ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

সি চিন পিং বলেন, বহুমেরুকরণ বলতে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থাকে বোঝানো উচিত যেখানে সব দেশ—বড় বা ছোট, শক্তিশালী বা দুর্বল, ধনী বা দরিদ্র—অধিকার, সুযোগ ও নিয়মের ক্ষেত্রে সমান মর্যাদা পাবে।

তিনি বলেন, সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা হতে হবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। একই সঙ্গে বহুমেরুকরণকে সুশৃঙ্খল রাখতে আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা এবং সংলাপকে প্রধান পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

চীনা প্রেসিডেন্ট দ্বৈত মানদণ্ড, ব্যতিক্রমবাদ, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং ‘বনের নিয়ম’ বা শক্তিশালীর আধিপত্যের সমালোচনা করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আইনি ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধিত্ব এবং বক্তব্য রাখার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সি চিন পিং বলেন, বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান সব দেশের আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত এবং আন্তর্জাতিক নিয়মও সব দেশের যৌথ অংশগ্রহণে তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বড় দেশগুলোর আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সহযোগিতা করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভূমিকা পুনরুজ্জীবিত করার ওপরও জোর দেন সি চিন পিং।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ও কার্যকর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে সেগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

উন্নয়নকে বৈশ্বিক এজেন্ডার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি উন্মুক্ত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলেন। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল যেন বিশ্বের সব দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও জোর দেন চীনা নেতা।

শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ভূমিকা আরও জোরদার করতে সি চিন পিং তিনটি প্রস্তাব দেন।

প্রথমত, এসসিওর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইউরেশিয়া অঞ্চলে সমৃদ্ধি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতার মাধ্যমে ইউরেশিয়ার বিভিন্ন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

দ্বিতীয়ত, এসসিওর অভিজ্ঞতা ও ‘শাংহাই স্পিরিট’ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন। এ ক্ষেত্রে এসসিও প্লাসের অংশীদারদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেন তিনি।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে এসসিওকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান চীনা প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, জোটের রাজনীতির পরিবর্তে অংশীদারত্ব এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈশ্বিক শাসনে সব দেশের সমান অংশগ্রহণ ও সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এসসিওর সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমন এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ।

এ ছাড়া মঙ্গোলিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, মিসর, লাওস, তুরস্ক, ভিয়েতনাম ও টোগোর মতো আমন্ত্রিত দেশগুলোর নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রধানরাও এতে উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনের আগে সি চিন পিং কিরগিজ প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের দেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে আয়োজিত স্বাগত ভোজে অংশ নেন এবং অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে যৌথ ছবিতে অংশ নেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা ছাই ছি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইসহ চীনের অন্যান্য কর্মকর্তাও এসব কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।

সি চিন পিং বলেন, ২৫ বছরের পথচলায় শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বড় ও ছোট, শক্তিশালী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। বর্তমানে সংস্থাটি বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত।

তার মতে, আরও ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় এসসিও বিশ্ব বহুমেরুকরণ এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোকে সময়ের পরিবর্তন বুঝে জনগণকেন্দ্রিক নীতি, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *