তামাক-নিকোটিনের ঝুঁকি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষায় কার্যকর আইন চাইলেন বিশেষজ্ঞরা

ঢাকায় তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আলোচনা।

তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। একই সঙ্গে ই-সিগারেট, ভেপিংসহ নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্যের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে ‘অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, এমপি।

মন্ত্রী বলেন, সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। তামাক ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী ও যন্ত্রণাদায়ক রোগের অন্যতম কারণ। এর ফলে মানুষের অকালমৃত্যুও ঘটছে।

তিনি বলেন, পরবর্তী প্রজন্মকে ভালোবাসলে প্রতিটি পরিবারে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে সচেতনতামূলক ছবি ও বার্তার প্রচার আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে জানানো জরুরি বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী। তার মতে, কৈশোর থেকেই তামাকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে তরুণদের তামাক গ্রহণ থেকে দূরে রাখা সহজ হবে।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, তামাক ব্যবহার অসংক্রামক রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি। ধূমপানসহ বিভিন্ন ধরনের তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যবহারকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পরিবার ও সমাজের ওপরও পড়ে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মক্ষমতা কমে। এতে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বক্তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নজরদারি ও প্রয়োগব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

আলোচনায় ই-সিগারেট, ভেপিংসহ নতুন ও উদীয়মান নিকোটিন পণ্যের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বক্তারা বলেন, তরুণদের মধ্যে এসব পণ্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তরুণদের এসব পণ্যে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ কারণে এসব পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও প্রচারের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে মত দেন তারা। পাশাপাশি এসব পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তরুণদের সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বক্তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের ( এফসিটিসি) আলোকে কার্যকর, সমন্বিত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি আরও শক্তিশালী করার আহ্বানও জানানো হয়। একই সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তামাক নিয়ন্ত্রণের নীতি ও আইন আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি এবং বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সহ-সভাপতি এস এম ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম।

সেমিনারে সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *