নিউইয়র্কে নোভাক জোকোভিচের জন্য রাতটি ছিল হতাশার। ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ডেই আর্জেন্টিনার ২৫ বছর বয়সী মারিয়ানো নাভোনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী সার্বিয়ান এই টেনিস কিংবদন্তি।
রবিবার (৩০শে আগস্ট) রাতে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে ৪ ঘণ্টা ৩৬ মিনিটের লড়াই শেষে নাভোনে জয় পান ৭-৬(৫), ৫-৭, ৪-৬, ৬-২, ৬-১ গেমে। ম্যাচটি ছিল গ্র্যান্ড স্ল্যামে জোকোভিচের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভেঙে গেল জোকোভিচের দীর্ঘদিনের একটি রেকর্ড। ২০০৬ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর এই প্রথম কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামের প্রথম রাউন্ডে হারলেন তিনি। এর আগে টানা ৭৮টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টে প্রথম রাউন্ড ম্যাচে পরাজিত হননি ২৪ বারের গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়ন।
ম্যাচের শুরু থেকেই জোকোভিচকে পুরোপুরি স্বাভাবিক মনে হয়নি। একপর্যায়ে তিনি বমি করেন। চতুর্থ ও পঞ্চম সেটের মাঝেও চিকিৎসা নেন। পিঠে ম্যাসাজ করানোর পাশাপাশি ওষুধও নিতে হয় তাঁকে।
ম্যাচ শেষে জোকোভিচ জানান, শারীরিক সমস্যাটি নতুন নয়। চলতি বছর প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তিনি বমি, বমি ভাব, ক্র্যাম্প ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথার মতো সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন।
“আমি নিজেকে উপভোগ করিনি। মনে হয়েছে কোর্টে থাকাটা আমার জন্য ভয়ানক অনুভূতি ছিল,” বলেন জোকোভিচ।
তিনি আরও জানান, শেষ দিকে তাঁর পিঠ ও কাঁধের সমস্যাও বেড়ে যায়। শরীর আর সাড়া না দেওয়ায় ম্যাচটি শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শারীরিক সমস্যার প্রভাব পড়ে তাঁর খেলাতেও। ম্যাচে জোকোভিচ ৭০টি আনফোর্সড এরর করেন।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য জোকোভিচের পক্ষেই ছিল। প্রথম সেটে তিনি ৪-১ গেমে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নাভোনে ঘুরে দাঁড়িয়ে টাইব্রেকারে সেটটি জিতে নেন।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেটে অবশ্য অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন জোকোভিচ। পরপর দুই সেট জিতে ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যান তিনি। তখন মনে হচ্ছিল, শারীরিক সমস্যাকে পেছনে ফেলে আবারও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তিনি।
কিন্তু চতুর্থ সেটে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ক্র্যাম্প ও ব্যথায় জর্জরিত জোকোভিচ টানা আটটি গেম হেরে যান। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম সেটেও আর লড়াইয়ে ফিরতে পারেননি তিনি।
জোকোভিচকে হারানো নাভোনের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। ২৫ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৪৮ নম্বরে আছেন।
শৈশব থেকেই জোকোভিচকে আদর্শ মানতেন নাভোনে। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, জোকোভিচের মতো খেলোয়াড়ের বিপক্ষে আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে খেলা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
“আপনি এই কোর্টে ‘জিওএটি’-এর সঙ্গে খেলছেন। অবশ্যই, এটি আমার কোর্টে পাওয়া সেরা অভিজ্ঞতা,” বলেন নাভোনে।
ইউএস ওপেনের প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের ফলে জোকোভিচের র্যাঙ্কিংয়েও বড় পরিবর্তন আসছে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো তিনি এটিপি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশের বাইরে চলে যাবেন।
আরেকটি পরিসংখ্যানও জোকোভিচের বিদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরছে। এবারের ইউএস ওপেনে দ্বিতীয় রাউন্ডে জোকোভিচ, রজার ফেদেরার ও রাফায়েল নাদাল—এই তিন কিংবদন্তির কেউই থাকছেন না। ২০০৩ সালের ফরাসি ওপেনের পর কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।
২০২৩ সালের ইউএস ওপেনে ২৪তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের পর থেকেই জোকোভিচের সামনে ছিল নতুন ইতিহাসের হাতছানি—২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা।
কিন্তু এরপর থেকে আর কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিততে পারেননি তিনি। ইউএস ওপেনের এই পরাজয়ের পর তাঁর শিরোপাহীন সময় আরও দীর্ঘ হলো।
ম্যাচ শেষে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিশ্চিত কোনো বার্তা দেননি জোকোভিচ। বরং শারীরিক অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে তিনি কতদিন সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
“আমি সত্যিই চেষ্টা করছি বুঝতে কী চলছে এবং এইভাবে আমি কতদূর যেতে পারি,” বলেন তিনি।
নিউইয়র্কে তাই জোকোভিচের এই বিদায় শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয়। এটি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ও হতে পারে। তবে তিনি আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে আবার ফিরবেন কি না, সেই উত্তর এখনো সময়ের হাতে।