ফিঙ্গারপ্রিন্টের ইতিহাসে যে বাঙালির অবদান ভুলে গেছে বিশ্ব

খুলনার পায়গ্রাম কসবায় জন্ম নেওয়া বিজ্ঞানী কাজি আজিজুল হক

ডাঃ মআআ মোক্তাদির

অপরাধী শনাক্ত করতে আজ আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আধুনিক বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার বিকাশেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বাংলাদেশের এক বিস্মৃত কৃতী সন্তান—খান বাহাদুর কাজি আজিজুল হক (১৮৭২–১৯৩৫)।

খুলনার ফুলতলার পায়গ্রাম কসবায় জন্ম নেওয়া এই বাঙালি গণিতবিদ ও পুলিশ কর্মকর্তা উনিশ শতকের শেষ দিকে অপরাধী শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট শ্রেণিবিন্যাসের একটি কার্যকর গাণিতিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি এবং ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা হেমচন্দ্র বসু। তাঁদের যৌথ কাজ থেকেই পরবর্তীকালে ‘হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম’ পরিচিতি পায়।

কাজি আজিজুল হকের জন্ম ১৮৭২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের খুলনা জেলার ফুলতলার পায়গ্রাম কসবায়। ছোটবেলা থেকেই গণিতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। পরে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন।

১৮৯২ সালে তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। তৎকালীন কলকাতা পুলিশের কর্মকর্তা এডওয়ার্ড হেনরি ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক অপরাধী শনাক্তকরণ নিয়ে কাজ করছিলেন। শক্তিশালী পরিসংখ্যান ও গণিতের জ্ঞানসম্পন্ন একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ছিল তাঁর। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আজিজুল হকের নাম সুপারিশ করা হয়। এরপর তিনি পুলিশ বিভাগে যোগ দেন।

তখন অপরাধী শনাক্তকরণে ‘অ্যানথ্রোপোমেট্রি’ বা মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাপভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এই পদ্ধতি ছিল সময়সাপেক্ষ। বড় আকারের অপরাধী রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় এর সীমাবদ্ধতাও ছিল।

আজিজুল হক এই সমস্যার সমাধানে ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে কাজ শুরু করেন।

আজিজুল হকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ফিঙ্গারপ্রিন্টকে দ্রুত সাজানো ও খুঁজে বের করার জন্য একটি গাণিতিক কাঠামো তৈরি করা।

গবেষণায় তিনি আঙুলের ছাপকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করেন। তাঁর তৈরি সূত্রের মাধ্যমে ফিঙ্গারপ্রিন্টের রেকর্ড ৩২টি কলাম ও ৩২টি সারির সমন্বয়ে মোট ১ হাজার ২৪টি খোপে ভাগ করা সম্ভব হয়। এর ফলে বিপুল সংখ্যক ফিঙ্গারপ্রিন্টের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট রেকর্ড খুঁজে বের করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

১৮৯৭ সালের মধ্যে আজিজুল হকের সংগ্রহে প্রায় ৭ হাজার ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেট জমা হয়েছিল বলে গবেষক কলিন বিভানের উদ্ধৃত তথ্য থেকে জানা যায়। তাঁর শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি বড় আকারের সংগ্রহকে তুলনামূলক ছোট ছোট দলে ভাগ করে দ্রুত অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছিল।

এর ফলে অপরাধীর রেকর্ড শনাক্ত করার কাজ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত করা সম্ভব হয়।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট শ্রেণিবিন্যাসের এই পদ্ধতি পরবর্তীকালে ‘হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম’ নামে পরিচিত হয়। নামটি এসেছে স্যার এডওয়ার্ড হেনরির নাম থেকে।

তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল। এই পদ্ধতির গাণিতিক ভিত্তি তৈরিতে আজিজুল হকের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হেমচন্দ্র বসুও পদ্ধতিটির উন্নয়ন ও উপশ্রেণিবিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

আধুনিক গবেষণায় তাই হেনরি সিস্টেমকে কেবল একজন ব্যক্তির উদ্ভাবন হিসেবে দেখার পরিবর্তে আজিজুল হক, হেমচন্দ্র বসু ও এডওয়ার্ড হেনরির সম্মিলিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এর গাণিতিক কাঠামো তৈরিতে আজিজুল হকের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৮৯৬ সালে বাংলার পুলিশকে কারাবন্দিদের নৃতাত্ত্বিক পরিমাপের পাশাপাশি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট পদ্ধতি অ্যানথ্রোপোমেট্রির তুলনায় বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়।

১৮৯৭ সালে কলকাতায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর বাংলায় অপরাধী শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে এই পদ্ধতি ব্রিটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯০১ সালে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে ব্রিটিশ ভারতের পুলিশি ব্যবস্থায় পরীক্ষিত একটি পদ্ধতি আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তের অংশ হয়ে ওঠে।

আজিজুল হকের অবদানের ইতিহাসের সঙ্গে স্বীকৃতির একটি জটিল অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে।

‘হেনরি সিস্টেম’ নামকরণের কারণে এর কৃতিত্ব দীর্ঘদিন মূলত এডওয়ার্ড হেনরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে গবেষণায় উঠে আসে, আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বসুর অবদান ছিল মৌলিক।

ভারতীয় গবেষক জি এস সোধি ও জাসজিত কৌরের গবেষণায় দুই ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তার অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। ১৯২৫ সালে দ্য স্টেটসম্যান-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আজিজুল হকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যথেষ্ট স্বীকৃতি না পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে এডওয়ার্ড হেনরিও আজিজুল হকের অবদানের কথা স্বীকার করেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাঁর অবদানের স্বীকৃতির সুপারিশও করা হয়েছিল।

কাজি আজিজুল হকের কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি পুলিশ বিভাগে উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বিহারের চম্পারান অঞ্চলে বসবাস করেন। ১৯৩৫ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের একটি অংশ পূর্ববঙ্গে চলে আসেন।

আজিজুল হকের অবদান শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের স্বীকৃতির সঙ্গেও।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিভিশনের ‘আজিজুল হক এন্ড হেম চন্দ্র বোস প্রাইজ’ নামে একটি পুরস্কার চালু রয়েছে। ফরেনসিক শনাক্তকরণে উদ্ভাবনী কাজের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে দুই ভারতীয় উপমহাদেশীয় পুলিশ কর্মকর্তা একসময় তাঁদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করেছিলেন, তাঁদের নামই এখন ফরেনসিক বিজ্ঞানের একটি পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত।

কাজি আজিজুল হকের মৃত্যুর ৯১ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশে তাঁর অবদান নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা এখনও সীমিত।

তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছিলেন, যখন কম্পিউটার ছিল না। ছিল না আধুনিক বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি। বিপুল সংখ্যক অপরাধীর রেকর্ডকে দ্রুত শ্রেণিবদ্ধ করার সমস্যার সমাধানে তিনি গণিতকে ব্যবহার করেছিলেন।

আজকের ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি তাঁর সময়কার পদ্ধতির সরাসরি প্রতিরূপ নয়। আধুনিক এএফআইএস ব্যবস্থায় আরও উন্নত রিজ-ফ্লো ও কম্পিউটারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবু হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম আধুনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ড ব্যবস্থার বিকাশে ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

ফলে কাজি আজিজুল হকের গল্প কেবল একজন বাঙালি পুলিশ কর্মকর্তার গল্প নয়। এটি বিজ্ঞান, গণিত ও অপরাধ তদন্তের ইতিহাসে উপমহাদেশের অবদানের গল্প।

বিশ্বের অপরাধ তদন্তে আঙুলের ছাপ আজ একটি স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক উপাদান। সেই ব্যবস্থার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে খুলনার পায়গ্রাম কসবায় জন্ম নেওয়া একজন বাঙালি গণিতবিদের নাম জড়িয়ে আছে।

কাজি আজিজুল হককে তাই শুধু ‘হেনরি সিস্টেম’-এর একজন সহযোগী হিসেবে নয়, এর গাণিতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে স্মরণ করা জরুরি। তাঁর জন্মভূমি, বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিজ্ঞান—সব জায়গাতেই তাঁর অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *